স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম এবং এর উপসর্গে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১১৭ দিনে দেশজুড়ে হাম ও এর সমগোত্রীয় উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। মহামারি আকার ধারণ করা এই ভাইরাসের প্রকোপে বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি জনস্বাস্থ্য খাতে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে যে ৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তবে এই নির্দিষ্ট সময়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে নতুন কোনো deaths বা মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১২৮ জন রোগীর শরীরে পরীক্ষাগারে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে। একই সময়ে আরও ৯০১ জন রোগীর শরীরে এই রোগের স্পষ্ট উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৯৯ জনে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং বায়ুবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে অতি দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে তীব্র জ্বর, অনবরত কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে সারা শরীরে লালচে রঙের ছোট ছোট দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। যথাযথ সময়ে সুচিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা না গেলে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। এর ফলে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কান পাকা, চোখের ক্ষতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিল উপসর্গ দেখা দেয়, যা মূলত শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলছেন, দেশের বর্ধিত জনসংখ্যা এবং কিছু দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সীমাবদ্ধতার কারণে এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন কারণে যেসব শিশু শৈশবে হাম ও রুবেলার (এমআর) নির্ধারিত ডোজ গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে বস্তি এলাকা এবং প্রত্যಂತ অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টিহীনতা এই রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে। সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক কর্নার বা বিশেষ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা এড়াতে পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্দেহভাজন রোগীদের তথ্য সংগ্রহ এবং টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
চিকিৎসকেরা অভিভাবকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শিশুর শরীরে হামের কোনো লক্ষণ দেখা মাত্রই তাকে সাধারণ শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝে ছড়াতে না পারে। রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি, তরল খাবার এবং সহজে হজম হয় এমন পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ সেবন করানো যাবে না। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট বা তীব্র ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন, চলমান এই প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দেশের শতভাগ শিশুকে বাধ্যতামূলকভাবে এমআর টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। একই সাথে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়িয়ে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এবং মৃত্যুর মূল কারণ দ্রুত নিরূপণ করা প্রয়োজন। যে সমস্ত এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা সম্পূরক টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার তাগিদ দিয়েছেন তারা। দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে তারা উল্লেখ করেন।