নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা–২০২৫-এর ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই ওয়েব পোর্টালে আপলোড বা ফাঁসের ঘটনায় এক কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বরখাস্ত হওয়া ওই কর্মকর্তার নাম মো. মেহতাব কায়েস। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ না করে নির্ধারিত সময়ের আগে ফলাফল প্রকাশ করার মাধ্যমে অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি कर्मचारी (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ১২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ৯ জুলাই অর্থাৎ ফলাফল আপলোডের দিন থেকে মো. মেহতাব কায়েসকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা প্রাপ্য হবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার গাফিলতি খতিয়ে দেখবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত বুধবার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়েব লিংক তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসকে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাকে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যে, কোনো অবস্থাতেই যেন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে ফলাফল লাইভ সার্ভার বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ওয়েব পোর্টালে আপলোড করা না হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা ও তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘন করে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল সংশ্লিষ্ট লিংকে আপলোড করা হয়।
ফলাফলের লিংকটি সচল হওয়ার পরপরই সাধারণ ব্যবহারকারী, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা তা দেখতে পান এবং ডাউনলোড করতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর বৃত্তি পরীক্ষার এই ফলাফল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণার যে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও তথ্যপ্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তা মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে এই ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক গাফিলতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এর আগেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ফলাফল ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতিরোধে আরও কঠোর ডেটা প্রটেকশন প্রটোকল এবং ব্যাক-এন্ড মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তে গঠিত কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আর কোনো ত্রুটি ছিল কি না বা এর পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রটোকল আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।