আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ইতিবাচক দিকে মোড় নেওয়ার ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমন ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশাবাদ তৈরি হওয়ায় তেলের মূল্য গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় সূচকেই এই দরপতন লক্ষ করা গেছে। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আলোচনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম গড়ে এক শতাংশের বেশি হ্রাস পায়।
আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৭১ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট সূচকের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ৬৮ দশমিক ৫৮ ডলারে নেমে এসেছে। উভয় সূচকের এই মূল্য গত মার্চ মাসের পর সর্বনিম্ন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের দোহায় দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ার খবরের পর বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ অনেকটাই কেটে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মূল্যের ওপর।
সম্প্রতি মার্কিন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এবং চলমান আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দোহায় অনুষ্ঠিত এই কারিগরি বৈঠকে মূলত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরাসরি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার কিছু বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনও কিছুটা দূরত্ব থাকলেও হরমুজ প্রণালি সচল রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু সামরিক উত্তেজনা সত্ত্বেও এই আলোচনাকে বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতার জন্য বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক বাজারে তেল উৎপাদনের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ওই অঞ্চলের জলসীমায় তেলবাহী জাহাজের যাতায়াত ইতিমধ্যে যুদ্ধপূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক আমদানিকারকদের স্বস্তি দিচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যের পূর্বাভাস হ্রাস পাওয়া। বৈশ্বিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, টানা পাঁচ মাস বৃদ্ধির পর ২০২৬ সালের জন্য তেলের দামের বৈশ্বিক পূর্বাভাস প্রথমবারের মতো কমিয়ে আনা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি সচল হওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার যে বড় ঝুঁকি ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এই দরপতনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে অপরিশোধিত তেলের মজুত উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত গত সপ্তাহে ৩৮ লাখ ব্যারেল কমে ৪০ কোটি ৮৪ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্ন মজুত। মূলত আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটি ও উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশটির তেল শোধনাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অবশ্য বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় এই মজুত হ্রাসের হার কিছুটা কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৪৫ ডলার হ্রাস পেয়েছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক দরপতন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩১ ডলার, যা ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারির পর একক প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় পতনের রেকর্ড। বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চূড়ান্ত সমঝোতার দিকে এগোলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও স্থিতিশীল হতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।