শীর্ষ সংবাদ ডেস্ক
চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় সৃষ্ট দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে ১০টি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় বন্যা ও পাহাড়ধস কবলিত জেলাগুলোতে উদ্ধারকাজ, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন সরকারের এই জরুরি সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগগুলোর কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দুর্যোগ পরিস্থিতি কেন্দ্র থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দুর্গত মানুষের সহায়তায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের টানা বর্ষণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য জেলা ও চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে মানবিক সহায়তা ও দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যাদুর্গত জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়গ্রহণকারী নাগরিকদের জন্য তিন বেলা খাবার, নিরাপদ খাবার পানি, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশুখাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা প্লাবিত অঞ্চলে উপস্থিত থেকে স্বশরীরে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জেনারেল রিলিফ (জিআর) কর্মসূচির আওতায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি জেলার জন্য বিশেষ আর্থিক ও খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার দুর্গত মানুষের জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা নগদ অনুদান এবং ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ শুরু হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড একযোগে কাজ করছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা নেমে এসেছে। সার্বিক নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থা বিবেচনা করে দুর্যোগকবলিত জেলাগুলোতে চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে পরীক্ষার পুনর্নির্ধারিত সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হতাহতদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করছেন।
দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের বড় একটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এই রেলপথের জলাবদ্ধতার ঝুঁকি স্থায়ীভাবে কমাতে ৪৭ কিলোমিটার রেলপথের উচ্চতা ৫ ফুট বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উন্নয়ন কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের জন্য নিরাপদ স্থানে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদেরও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ প্রয়াসে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকটের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।