নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকায় অপরাধ বৃদ্ধি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনের সাথে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিজস্ব তথ্য-উপাত্তের কোনো মিল নেই বলে দাবি করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে সার্বিক অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ থানা পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার এসব কথা বলেন।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, টিআইবির প্রতিবেদনে রাজধানীতে অপরাধ পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা পুলিশের প্রশাসনিক নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের নিয়মিত তদারকির তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পুলিশের নিয়মিত অপরাধ পরিসংখ্যান, থানাভিত্তিক মামলা ও জিডির হিসাব এবং নিয়মিত টহল দলের পর্যালোচনায় ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। টিআইবি কোন প্রক্রিয়ায় বা কী ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং সংরক্ষিত সরকারি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব।
রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে ডিএমপি কমিশনার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শহরের অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশি তৎপরতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংবেদনশীল স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চব্বিশ ঘণ্টা পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মতো প্রথাগত অপরাধের সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল অপরাধ দমনই পুলিশের একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত কর্মপরিবেশ উন্নত করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘসময় ধরে টানা দায়িত্ব পালন, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে পুলিশ সদস্যরা অনেক সময় তীব্র মানসিক চাপে ভোগেন। এই মানসিক চাপ তাদের পেশাগত কার্যক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের প্রতি সেবার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি আরও জানান, ডিএমপি সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কাজের পরিবেশ সুগম করতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের চাপ কমাতে অভ্যন্তরীণ কর্মঘণ্টা পুনর্নির্ধারণ এবং পর্যায়ক্রমে বিশ্রামের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা পেশাগত কারণে কোনো সদস্য মানসিক অবসাদ বা চাপে ভুগলে তা গোপন না রেখে সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা উচিত। যাতে সময়মতো উপযুক্ত প্রশাসনিক সহায়তা ও পেশাদার কাউন্সিলিং প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
রাজধানীর স্থায়ী ও ভাসমান বিপুল জনসংখ্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি জটিল চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার জানান, সাধারণ জনগণের জানমালের সুরক্ষা প্রদানে ডিএমপি সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের ওপর জোর দেন তিনি। কোনো এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য বা সন্দেহভাজন গতিবিধি লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানা বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানোর জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, টিআইবির মতো নাগরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের মধ্যকার এই বৈষম্য দূর করতে উভয় পক্ষের উন্মুক্ত আলোচনা ও তথ্য আদান-প্রদান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে রাজধানীর প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বস্তুনিষ্ঠ চিত্র ফুটে উঠবে এবং অপরাধ দমনে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, পুলিশ বাহিনীর চলমান তদারকি ও কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ঢাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত ও টেকসই রূপ লাভ করবে।