আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতপূর্ণ হুমকি ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন পরিকাঠামোসহ তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর কঠোর পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের অভ্যন্তরীণ কোনো সেতু বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সামরিক হামলা চালানো হলে তার জবাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পরিকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে দেশটি।
ইরানের সামরিক সূত্রে জানানো হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ওপর যেকোনো আঘাতকে তেহরান চূড়ান্ত আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করবে। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীরা নজিরবিহীন পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে বলে উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ, বিশেষত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের তদারকি বজায় রাখার বিষয়টিকে পুনর্ব্যক্ত করে তেহরান জানায়, নিজস্ব পানিসীমা বা ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হুমকি বরদাশত করা হবে না। আন্তর্জাতিক নির্ধারিত নিয়ম ও প্রশাসনিক সমন্বয় মেনে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করলে এই প্রণালী সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। তবে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হলে তা সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য গুরুতর পরিণতি বয়ে আনবে বলে সতর্ক করা হয়।
সংঘাতের নতুন এই অধ্যায়ের সূত্রপাত ঘটে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মার্কিন বার্তাকে কেন্দ্র করে। সেখানে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রমকারী কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজে ইরান যদি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট কিংবা ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়, তবে প্রতিবারই তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরানসহ দেশটির অভ্যন্তরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বোমাবর্ষণ করা হবে। আন্তর্জাতিক পানিপথে সমুদ্র বাণিজ্য ও চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই অবস্থান ব্যক্ত করা হয়।
এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাটি লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘অপারেশন নাসর ২’-এর ২৫তম ধাপের আওতায় জর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ কিং ফয়সাল এবং প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে এই সমন্বিত হামলা চালানো হয়। অভিযানে এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমানের জন্য সংরক্ষিত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং কনটেইনারে থাকা আটটি নতুন এমকিউ-নাইন ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে আইআরজিসি। একই সঙ্গে ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক কর্মীদের মাঝে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
আইআরজিসির তরফ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মার্কিন আগ্রাসন ও বিমান হামলা যদি অব্যাহত রাখা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও কঠোর এবং চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরু করা হবে। তারা সতর্ক করে জানায়, এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের জাতীয় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
উভয় পক্ষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক সংঘাতের ফলে সাধারণ বেসামরিক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিমান ও ড্রোন হামলাগুলোতে এ পর্যন্ত দেশটির অন্তত ৫৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ছয়শ মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থানে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের মূল রুট হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৈরি হওয়া এই তীব্র অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।