বিশেষ প্রতিবেদক
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। একসময় ডেঙ্গুকে কেবল রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমান পরিসংখ্যানে দেশের বিভিন্ন জেলা নতুন করে সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র বা হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এডিস মশার প্রজনন রোধ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৬ হাজার ৪৫৮ জন রোগী। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ জন, যা পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি এবং এটি ভরা মৌসুমে সংক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, দেশের মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭৭ দশমিক ১ শতাংশই এখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে চিকিৎসাধীন। বিভাগভিত্তিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকাকে ছাড়িয়ে বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে বরিশাল বিভাগ। এই বিভাগে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৩৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা দেশের মোট আক্রান্তের প্রায় ২৭ শতাংশ। এরপরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ (১,২০১ জন), ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগ (৭৯৮ জন), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা (৯৩১ জন) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা (৫৪৯ জন)। জেলা পর্যায়ের হিসেবে বর্তমানে পিরোজপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী জেলায় সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের মতে, ঢাকার বাইরে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম জেলা এডিস মশার নতুন হটস্পট হয়ে উঠেছে। তবে এসব প্রত্যন্ত এবং জেলা শহরগুলোর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত বাজেটের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ, মশক নিধন সামগ্রী সরবরাহ এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করার কথা জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জানিয়েছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিগত দুই মাস ধরে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে মশার লার্ভা দ্রুত ধ্বংস করার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল ট্যাবলেট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা ছোট ছোট জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা কিংবা পরিত্যক্ত টায়ারে ব্যবহার করা হবে। স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রক্রিয়া চলছে।
তবে মাঠ পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে দক্ষ কীটতত্ত্ববিদের তীব্র সংকট। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে একমাত্র ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ছাড়া বাকি ১১টি করপোরেশনেই কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। এ ছাড়া দেশের মাত্র ২৬টি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কীটতত্ত্ববিদের অনুমোদিত পদ রয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয় ও সদর দপ্তরসহ অনুমোদিত ৩৩টি কীটতত্ত্ববিদ পদের মধ্যে অন্তত ১৮টি পদই বর্তমানে খালি পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার প্রজাতি, বিস্তার, প্রজননস্থল, কীটনাশকের কার্যকারিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্ত করার জন্য কীটতত্ত্ববিদদের ভূমিকা অপরিহার্য। তাদের পেশাদার পরামর্শ ছাড়া কেবল ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জেলা শহর ও পৌর এলাকাগুলোতে মশক নিধন কার্যক্রম ঢাকার চেয়ে দুর্বল হওয়ায় এবার সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে নিয়মিত লার্ভিসাইডিং বা লার্ভা ধ্বংস, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দুই মাসে দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।