বিশেষ প্রতিবেদক
মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রীর দফতর কক্ষে এ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নারী ও শিশুদের টেকসই উন্নয়ন, লিঙ্গ সমতা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অনলাইনে সাইবার বুলিং এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নির্মূলসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন এনডিসি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশের সামাজিক খাতের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। সমাজকল্যাণমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা নির্মূলের মাধ্যমে সকলের জন্য একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক সামাজিক নিরাপত্তা, নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন হাইকমিশনার।
আলোচনাকালে মন্ত্রী মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত চলমান বিভিন্ন কল্যাণমুখী কার্যক্রমের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওএসসিসি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) এবং ডিএনএ ল্যাবের কার্যক্রম সম্পর্কে হাইকমিশনারকে অবহিত করেন। যৌন হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের দ্রুত ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করছে।
এছাড়া দেশের প্রান্তিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের বিশেষ উদ্যোগের কথা বৈঠকে জানানো হয়। মন্ত্রী বলেন, চা শ্রমিক, সাঁওতাল ও পাহাড়ে বসবাসরত পিছিয়ে পড়া নারীদের শিক্ষা, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি, নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে হস্তশিল্প ও কেয়ার-গিভিং বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের কল্যাণে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে বিনামূল্যে মিড-ডে মিল ও ইউনিফর্ম প্রদানের ব্যবস্থার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এর কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, দেশের অবহেলিত, অসচ্ছল, দরিদ্র, হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটালাইজড প্রক্রিয়ায় অনলাইনে নারীদের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে, যেখানে কোনো ধরনের ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক বৈষম্য করা হচ্ছে না।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীদের তৈরি হস্তশিল্প ও বিভিন্ন পণ্য যাতে যুক্তরাজ্যের বাজারে রফতানি করা যায়, সে বিষয়ে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা কামনা করা হয়। হাইকমিশনার সারাহ কুক এই প্রস্তাবের জবাবে ইতিবাচক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট ও ফুটবল দলের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারীদের এই অগ্রগতিকে বাংলাদেশের সামাজিক ক্ষমতায়নের ইতিবাচক নির্দেশক হিসেবে অভিহিত করেন।
বৈঠকের শেষাংশে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। হাইকমিশনার মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাজ্যের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা পুনরুল্লেখ করেন। একই সঙ্গে টেকসই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ উপায়ে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।