বিশেষ প্রতিবেদক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালের যাত্রী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পেতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক নামী কোম্পানিগুলো এই খাতে যুক্ত হতে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী সেবার মান বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় একজন অপারেটর নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এই টার্মিনালের কার্গো হ্যান্ডলিং বা পণ্য ওঠানো-নামানোর একক দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হাতেই থাকছে।
বেবিচক সূত্র নিশ্চিত করেছে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে আসছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে সেবার মান বৃদ্ধি এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে এবার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগ্রহী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডনাটা এবং সিঙ্গাপুরের স্যাটস। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে তাদের এই আগ্রহকে দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন বাজারে দেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতরা দেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে নিজ নিজ দেশের যোগ্য কোম্পানির সক্ষমতা তুলে ধরার এই তৎপরতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে। মূলত ক্রমাগত যাত্রী বৃদ্ধি, বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলেই বিশ্বখ্যাত এই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালন দক্ষতা এবং সেবার মান মূলত নির্ভর করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ওপর, যার মধ্যে রয়েছে উড়োজাহাজের কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চেক-ইন, র্যাম্প অপারেশন এবং উড়োজাহাজ অবতরণের পর দ্রুততম সময়ে পুনরায় ওড়ার উপযোগী করার প্রক্রিয়া (টার্নঅ্যারাউন্ড সার্ভিস)। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর মতে, এই খাতে নতুন ও অভিজ্ঞ অপারেটর যুক্ত হলে সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে এবং বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ প্রস্তুত করার সময় বা ‘গ্রাউন্ড টাইম’ অনেক কমে আসবে। স্থানীয় এভিয়েশন উদ্যোক্তা এবং বিশেষজ্ঞরা এই নীতিগত পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও স্বয়ংক্রিয় কার্গো ভিলেজের একক দায়িত্ব বিমানের হাতে রাখার বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
খাত সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের অতীত সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তৃতীয় টার্মিনালে যে অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে, সেগুলোর সর্বোচ্চ সুফল পেতে এবং স্থানীয় জনবলকে দক্ষ করে তুলতে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তারা মনে করেন। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এই দায়িত্ব পালনে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ও প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। বিমানের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রমের জন্য ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ১ হাজারের বেশি অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিমান একটি জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী, জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন সমন্বয়ে গঠিত জাপানি কনসোর্টিয়ামটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সার্বিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্বে থাকবে। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত একটি নতুন যুগে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাবে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।