বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে দেশের গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও প্রায়োগিক করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার (১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তথা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উপমহাদেশের উচ্চশিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় ও গণতান্ত্রিক সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বহু ত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই অর্জিত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং সুসংহত করা। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের শিক্ষা কারিকুলামকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন থেকেই নতুন কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে সংগতি রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোটেকনোলজি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির মতো অগ্রসর বিষয়গুলো দ্রুত শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শিক্ষাকে কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব না রেখে কর্মদক্ষতা ও প্রায়োগিক শিক্ষার দিকে ধাবিত করতে হবে, যা বাস্তব জীবনে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেবে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের (ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া) মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি জোরদার এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড বজায় রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সংস্কৃতি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে মৌলিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কর্মরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের (অ্যালামনাই) সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনেরা গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাইদেরও নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে এবং গবেষণাগার সমৃদ্ধকরণে আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের লক্ষ্যে সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সৃজনশীল চর্চাকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক কর্মবাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তরুণদের কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন।