আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের সামরিক সহায়তা বন্ধের লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেসে একটি নতুন বিল উত্থাপিত হতে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই বিলটির ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী চাপ ও যুদ্ধবিরতির আহ্বানের মধ্যেই প্রতিবেশী লেবাননে নিজেদের সামরিক অবস্থান বজায় রাখার অনড় ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা রাশিদা তালিব সম্প্রতি এই বিলটির প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেছেন। প্রস্তাবিত এই বিলের মূল লক্ষ্য ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩০ কোটি ডলারের বার্ষিক সামরিক সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। রাশিদা তালিব দাবি করেছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান সামরিক অভিযানের নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশই এখন ইসরায়েলকে এই ধরনের তহবিল জোগানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই বিলে রাশিদা তালিবের পাশাপাশি ইলহান ওমরসহ ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল ধারার আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা সমর্থন জানিয়েছেন। তবে দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিলটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি মূলত উত্থাপন করেছেন কেন্টাকির রক্ষণশীল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা থমাস ম্যাসি। ম্যাসি দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার কট্টর বিরোধী হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী লবির কারণে এই বিলটি পাস হওয়া বেশ কঠিন। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতার এই যৌথ উদ্যোগ ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া ইসরায়েল নীতির প্রতি অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গাজা ও লেবাননে বেসামরিক নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রশাসনের ওপর বিশ্বব্যাপী যে কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা এই বিলের মাধ্যমে মার্কিন সংসদের ভেতরেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো রকম উপশম না ঘটিয়ে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে তেল আবিব। গত মঙ্গলবার লেবানন সীমান্তের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া একটি নিরাপত্তা অঞ্চলে আকস্মিক সফরে যান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেখানে সম্মুখসারির সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করতে এবং সামগ্রিক যুদ্ধের কৌশলগত অবস্থান পর্যালোচনা করতে তিনি এই সফর করেন। পরিদর্শনের সময় নেতানিয়াহুর সঙ্গে নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা উপস্থিত ছিলেন।
সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তব্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর ইসরায়েলের সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা নেই। নেতানিয়াহু বলেন, হিজবুল্লাহ যতদিন পর্যন্ত সীমান্তে সশস্ত্র অবস্থায় থাকবে এবং ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের জন্য বিপদ হিসেবে গণ্য হবে, ততদিন ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের মাটিতে অবস্থান করবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইসরায়েল তাদের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের একটি বড় হুমকিও সাময়িকভাবে নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য লেবাননে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই অনড় অবস্থানের কারণে ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা বা কোনো কার্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়া আরও জটিল ও দীর্ঘায়িত হতে পারে, যার ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।