আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার ঐতিহাসিক নিয়ম বাতিল সংক্রান্ত এক নির্বাহী আদেশে বাধা দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে দেশটির আইনসভা কংগ্রেসের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়ন করে এই নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন।
ক্ষমতায় আরোহণের প্রথম দিনেই ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল, বৈধ নথিপত্রহীন কিংবা অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের সন্তানরা দেশটির মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই আদেশটি কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ নবজাতক শিশু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপটিই এখন দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে বড় ধরনের ধাক্কা খেল।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশটির আইনি বৈধতা নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর পরিপন্থী। আমেরিকার সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, পিতামাতার আইনি অবস্থান বা নথিপত্র যাই হোক না কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি শিশুই জন্মসূত্রে দেশটির পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করবে। ফলে সংবিধানের এই অলঙ্ঘনীয় ধারাকে উপেক্ষা করে কেবল নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই আইনি কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের এমন যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমের এক বার্তায় তিনি এই রায়কে দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে জানান যে, তার নিজের রাজনৈতিক মেয়াদে নিয়োগপ্রাপ্ত রক্ষণশীল বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত আদালতও এই নীতি সমর্থন না করায় তার সামগ্রিক অভিবাসন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। তবে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসছেন না এবং আদালতের মাধ্যমে এটি সফল না হলেও কংগ্রেসের সহায়তায় প্রয়োজনীয় আইন পাস করে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের দাবি, জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার এই শিথিল নিয়মের সুযোগ নিয়ে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ অবৈধ উপায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তবে ট্রাম্পের এই কঠোর অভিবাসন নীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছেন দেশটির মানবাধিকার কর্মী এবং অভিবাসী অধিকার রক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন। তাদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিলে তা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হবে এবং হাজার হাজার শিশুকে রাষ্ট্রহীন নাগরিকের ঝুঁকিতে ফেলবে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নির্বাহী ক্ষমতার বাইরে গিয়ে আইনসভার মাধ্যমে নতুন বিল পাস করার চ্যালেঞ্জ তৈরি হলো, যেখানে বিরোধী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের কারণে এমন আইন পাস করা বেশ জটিল হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।