আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর যৌথভাবে একটি সেবা মাশুল বা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে ইরান ও ওমান। তবে এই সমুদ্রসীমায় শত শত বছর ধরে চলে আসা মুক্ত নৌ-চলাচলের আন্তর্জাতিক রীতির বাইরে গিয়ে তেহরান ও মাস্কাটের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওমান এই শুল্ক ব্যবস্থাকে ঐচ্ছিক রাখতে চাইলেও ইরান এটিকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার একটি চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ধরনের মাশুল ছাড়াই নিরাপদে চলাচল করার কথা বলা হয়েছিল। তবে ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে একটি যৌথ বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইরান ও ওমানের ওপর। এরই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মডেলের অংশ হিসেবে এই টোল বা শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনাটি সামনে এসেছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ওমান মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা বা সিঙ্গাপুর প্রণালীর আন্তর্জাতিক শাসন ব্যবস্থার আদলে একটি কাঠামো তৈরি করতে আগ্রহী। মাস্কাটের লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল বজায় রাখার জন্য যে বিপুল ব্যয় হয়, তা এই শুল্কের অর্থ থেকে মেটানো। তবে ইরান এককভাবে প্রভাব বিস্তারের নীতিতে অনড় থাকায় ওমান একটি কূটনৈতিক মধ্যপন্থা বা বিকল্প উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে যদি কোনো যৌথ চুক্তি সম্পন্ন নাও হয়, তবে তেহরান একতরফাভাবেই এই প্রণালিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।
এদিকে ওমানের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলসীমা এবং এটি সবার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। কোনো রাষ্ট্র একক বা যৌথভাবে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। এই শুল্ক আরোপের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওমানকে লক্ষ্য করে সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন নেতৃত্বের এমন কঠোর অবস্থানের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে দুই দেশের কূটনীতিকদের ব্যাপক তৎপরতা চালাতে হয়। পরবর্তীতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সাথে এক গোপন বৈঠকে ওমানি কূটনীতিকরা বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের শুল্ক আরোপ বা একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইরানের একতরফা শুল্ক আদায়ের অনড় অবস্থান এবং ওমানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। ওমান ও ইরানের যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর এখন পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ-নিরাপত্তার সমীকরণ নির্ভর করছে।