বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে মর্মান্তিক ও নৃশংস জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্তিতে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক স্মরণসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কাউকেই দেশের শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে দেবে না। সন্ত্রাসবাদকে কোনো অবস্থাতেই যৌক্তিক হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই এবং বাংলাদেশ এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বদা শক্ত অবস্থানে থাকবে।
বুধবার (১ জুলাই) ঢাকাস্থ ইতালি দূতাবাসে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ১০ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সভায় হামলায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নিহতের স্বজনরা।
স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম হলি আর্টিজানের ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ১ জুলাই সংঘটিত সেই ভয়াবহ হামলা দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় আঘাত ছিল। তবে সরকার অত্যন্ত কঠোর হাতে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং পরবর্তী সময়ে এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ নিজস্ব ভূখণ্ডে সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তা, হামলায় নিহত দেশি-বিদেশি নাগরিকদের পরিবারের সদস্য এবং সেদিন হলি আর্টিজান থেকে জীবিত ফিরে আসা প্রত্যক্ষদর্শীরা সভায় অংশ নেন।
কূটনীতিকরা তাঁদের বক্তব্যে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সংহতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁরা বলেন, হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল। বাংলাদেশ যেভাবে এই সংকটের পর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্ক নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়েছে, তা প্রশংসনীয়।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে পাঁচজন সশস্ত্র জঙ্গি অতর্কিত হামলা চালায়। দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করার পর জঙ্গিরা ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিহত হন বাংলাদেশের দুই জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ অভিযানের মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে এবং পাঁচ জঙ্গি ও একজন সহযোগী নিহত হয়।
পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার তদন্ত শেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে দেশে উগ্রবাদী কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, ১০ বছর পূর্তির এই স্মরণসভা বাংলাদেশ এবং তার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।