ময়মনসিংহ — জেলা প্রতিনিধি
সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের জীবনের যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়, তা কোনো আর্থিক সহায়তা, ক্ষতিপূরণ বা অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ করা একেবারেই অসম্ভব। একটি দুর্ঘটনা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকেই শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং পুরো একটি পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে সামগ্রিকভাবে জনসাধারণের সকল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এই চেক বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিআরটিএ-এর ট্রাস্টি বোর্ডের তহবিল থেকে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ জন ব্যক্তির মাঝে মোট ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার চেক আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদানের লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন আইনের অধীনে এই বিশেষ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের মাধ্যমে সরকার দেশব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার এবং গুরুতর আহতদের এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। ময়মনসিংহের এই আয়োজন বর্তমান সরকারের সেই জনকল্যাণমুখী ও চলমান উদ্যোগেরই একটি অংশ, যা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাময়িক আর্থিক স্বস্তি প্রদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী আরও বলেন, বর্তমান সরকার সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলোকে সম্ভাব্য সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। কিন্তু সকলকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, সরকারি এই আর্থিক সহায়তা কখনোই একটি অমূল্য জীবনের বিকল্প হতে পারে না কিংবা একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সকলকেই সর্বপ্রথম নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল আইন প্রয়োগ বা কর্তৃপক্ষের নজরদারির ওপর নির্ভর করে সড়কে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পথচারী, চালক, যাত্রী এবং পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং দেশের প্রচলিত ট্রাফিক আইন বিনা শর্তে মেনে চলার মানসিকতা।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী বিষয়ে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপার হওয়া বা গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি কাজ, যা থেকে সকলকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। এছাড়া মহাসড়কের দুই পাশে বা শহরের ব্যস্ত ফুটপাত দখল করে যত্রতত্র অবৈধভাবে দোকানপাট বসানোর প্রবণতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম একটি প্রধান কারণ। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যেমন কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষকেও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।
গাড়ি চালকদের প্রতি বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেকোনো ধরণের যানবাহন চালানোর সময় চালক এবং যাত্রীদের অবশ্যই সিটবেল্ট পরিধান করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়াভাবে ওভারটেকিং করার প্রবণতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণেই মহাসড়কগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে থাকে। এই প্রাণহানি রোধ করতে তিনি চালকদের সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে গাড়ি চালানোর প্রতি আহ্বান জানান। সামগ্রিকভাবে, একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে তাগিদ প্রদান করেন।
ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস. এম. হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহনেওয়াজ অপু। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সাইফুর রহমান এবং পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তারা তাদের বক্তব্যে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রশাসনের নজরদারি, ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রম এবং মহাসড়ক নিরাপদ রাখার বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে উপস্থিত সকলকে অবহিত করেন।
এছাড়াও এই আয়োজনে আরও বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রব আকন্দ, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নজরুল ইসলাম, বিআরটিএ কর্মকর্তা ইফাত হাসেম এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী গোলাম মওলা। বক্তারা সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের করণীয় এবং প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর বক্তব্য সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে উপস্থিত সকলকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নিরাপদ সড়ক গড়তে সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত পোষণ করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম সমাপ্ত হয়।