বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী, বহুমাত্রিক ও গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিস্তিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেক্র। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিধি আরও বাড়ানো। স্পেনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের উদীয়মান বাজার এবং শিল্প খাতের উন্নয়ন ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের উৎপাদন শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি এবং ভারী অবকাঠামো নির্মাণ খাতে স্পেনের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আলোচনায় দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করার ওপর জোর দেওয়া হয়। রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিস্তিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেক্র জানান, স্পেনের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করতে আগ্রহী। এর ফলে বাংলাদেশে একদিকে যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়বে, অন্যদিকে স্পেনের উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেশের শিল্প খাতে যুক্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান ধারাকে স্বাগত জানান। তিনি স্পেনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) এবং হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান। উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষায় একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইনি জটিলতা হ্রাস এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশি অর্থায়নকে উৎসাহিত করার জন্য কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কৃষি, শিক্ষা, পর্যটন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সাথে স্থান পায়। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। একই সাথে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্পেনের সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র স্পেনের সাথে বাংলাদেশের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন বৈশ্বিক বাজারের অংশীদারিত্ব অত্যন্ত জরুরি। এই পরিস্থিতিতে স্পেনের মতো উন্নত দেশের সাথে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হলে তা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের পরবর্তী বিকল্পসমূহ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত সংলাপ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সাথে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।