শিক্ষা ডেস্ক
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গণিতভীতি দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ম্যাথ ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী একটি দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলার অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সাঁতারকুলে গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল পরিদর্শনকালে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এই পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান বিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিশুদের শৈশব থেকেই গণিত, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী চিন্তার ভিত্তি শক্তিশালী করা অপরিহার্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ম্যাথ ল্যাব একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই ল্যাবে গাণিতিক হাতে-কলমে শিক্ষার উপকরণ, জ্যামিতিক সরঞ্জাম এবং যুক্তিভিত্তিক খেলার সুবিধা থাকবে, যা শিশুদের শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী ও সৃজনশীল করে তুলবে।
ববি হাজ্জাজ আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিশনের আলোকে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্ভাবক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ পাবে। ম্যাথ ল্যাব স্থাপন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে অধিকতর আধুনিক, দক্ষতা-ভিত্তিক এবং প্রযুক্তিবান্ধব করে তুলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে গণিতভীতি দূর করতে ও গাণিতিক চিন্তাধারাকে সহজতর করতে প্রথাগত বইভিত্তিক শিক্ষার বাইরে হাতে-কলমে শিক্ষা বা ‘লার্নিং বাই ডুইং’ পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। ম্যাথ ল্যাবগুলো সাধারণত বিভিন্ন গাণিতিক মডেল, অ্যাবাকাস, জ্যামিতিক বক্স, চার্ট, এবং আধুনিক সফটওয়্যারের সমন্বয়ে গঠিত হয়, যা জটিল বিষয়গুলোকে শিশুদের কাছে সহজ ও আনন্দদায়ক করে উপস্থাপন করে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাণিতিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, যা পর্যায়ক্রমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো অনুধাবনে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নির্বাচন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু বিদ্যালয়ে এই ল্যাব স্থাপন করা হবে এবং পরবর্তীতে সাফল্যের ভিত্তিতে তা সম্প্রসারণ করা হবে। তবে ল্যাব স্থাপনের পাশাপাশি দক্ষ জনবল এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং ল্যাবের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
একইসঙ্গে এটি একটি স্মার্ট ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি উপস্থিত শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিশুদের কেবল মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল না রেখে তাদের সৃজনশীল ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বিকাশের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ এমন হতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখবে এবং সমস্যা সমাধানের আনন্দ উপভোগ করবে।
পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণে একটি প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে আসে। সরকার আশা করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি ভীতি দূর করে তাদের মেধার পূর্ণ বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।