অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসারে প্রথমবারের মতো ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী প্রায় ৬০০ একর জমিতে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। একই সাথে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড INDUSTRIAL জোন’ (সিইআইজেড) স্থাপনের লক্ষ্যে স্পেশাল পারপাস কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৭ জুন) সকালে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, দেশের প্রথম এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে প্রচলিত কাস্টমসের কঠোর নিয়মকানুন কার্যকর থাকবে না। এটি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। শুল্কমুক্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে পুনঃরপ্তানির প্রক্রিয়া সহজতর হবে। এর ফলে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল এবং অন্যান্য ভারী শিল্পে নতুন বিনিয়োগের দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আনোয়ারায় প্রস্তাবিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) প্রসঙ্গে ব্রিফিংয়ে বলা হয়, এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্যে স্পেশাল পারপাস কোম্পানির সাথে ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’ (উন্নয়ন চুক্তি) এবং ‘ল্যান্ড লিজ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (ভূমি ইজারা চুক্তি) অনুমোদন ও স্বাক্ষরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই জোনের সফল বাস্তবায়নের ফলে দেশের শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ ঘটবে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আনোয়ারার এই অঞ্চলটি চীনের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের একটি অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের বাজারে বৈচিত্র্যময় পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। একই সাথে এটি বাংলাদেশের কৌশলগত শিল্প উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং জ্বালানি তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। এই সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি ও জ্বালানি তেল ক্রয় করতে হচ্ছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জোর দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল ও গ্যাস ক্রয়ের প্রচলিত সনাতন পদ্ধতি এবং সরবরাহ চেইন পুনর্বিবেচনা বা পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে উৎসের বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতির সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা সচল রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এই বৈঠকে আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে রাশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতার মধ্যেও দেশের কৃষকদের জন্য সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে সারের চাহিদা মেটানো এবং টেকসই শস্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সার্বিকভাবে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন, জ্বালানি খাতের সংস্কার ভাবনা এবং কৃষি খাতের এই সামগ্রিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন।