বিশেষ প্রতিবেদক
দেশকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিসমর্থক অবস্থানে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীদের সত্যিকার অর্থে মৌলিক গবেষণায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, বিজ্ঞানীদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের গবেষণা বিদ্যমান বৈশ্বিক গবেষণা থেকে স্বতন্ত্র, নতুন এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম। একই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক ইনসেপশন ওয়ার্কশপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘মিঠাপানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের মৎস্যখাতে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এই খাতের টেকসই উন্নয়নে যুগোপযোগী গবেষণা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার মাধ্যমে যারা মৎস্যখাতের তথা দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন, সরকার তাদের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষভাবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবে। বর্তমান সরকার গুণীজন, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের যথাযথ মর্যাদা দিতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি বিকাশে তাদের ভূমিকার দিকে সরকার প্রত্যাশার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
দেশে সুনির্দিষ্ট গবেষণা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখনও গবেষণার একটি সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র ধারা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। দেশে যখন বিপুল পরিসরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তখন তার দৃশ্যমান ফলাফল ও নিজস্ব মানসম্পন্ন গবেষণা-ধারা প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক।
মাছ চাষের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পানির গুণগত মান মাছ চাষের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। পানিকে মাছের অনুকূল ও উপযোগী করে তুলতে পারলে মাছের রোগবালাই অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বিজ্ঞানী, গবেষক ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে দেশীয় ও প্রাকৃতিক মাছের অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট উত্তরণে দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে গবেষণা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা তৈরি এবং কার্যকর আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টি ও খাদ্যতালিকায় মিঠাপানির মাছের ভূমিকা অপরিসীম। এই মাছকে রোগমুক্ত রাখা এবং টেকসইভাবে খামার ব্যবস্থাপনা পরিচালনার লক্ষ্যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মড়ক নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ও কার্যকর গবেষণা পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।
খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে আলোকপাত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মাছ চাষে অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের এক ক্ষতিকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি গবাদিপশুর চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত কিছু অ্যান্টিবায়োটিকও মাছের খামারে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এই অনিয়ম প্রতিরোধে মৎস্য অধিদপ্তরকে কঠোর নজরদারি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উচিত নিজ নিজ দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করা। যেহেতু জনগণের করের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সেহেতু জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান।
ইনসেপশন ওয়ার্কশপে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মূল প্রবন্ধ ও কারিগরি দিক উপস্থাপন করেন ড. মো. সিরাজুম মনির। উন্মুক্ত আলোচনায় আলোচকরা মিঠাপানির মৎস্য চাষে রোগবালাইয়ের বর্তমান চিত্র এবং এর প্রতিকারে প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিএফআরআই-এর বিজ্ঞানী, গবেষক, মৎস্য বিশেষজ্ঞ এবং মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।