বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশে তরুণ ও যুব সমাজের একটি বড় অংশ বর্তমানে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও মাদকের আসক্তি, ক্যারিয়ারের তীব্র প্রতিযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব এবং সামাজিক কুসংস্কারের সম্মিলিত প্রভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় চিকিৎসা অবকাঠামো এবং পেশাদার চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে আক্রান্তদের একটি বড় অংশই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ থেকে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ হলো ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এই সীমিত বরাদ্দের কারণে দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ২১ থেকে শূন্য দশমিক ২৫ জন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বর্তমানে দেশে সরকারি পর্যায়ে মাত্র দুটি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল রয়েছে— ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইএমএইচ) এবং পাবনা মানসিক হাসপাতাল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শিশু, কিশোর ও যুবকদের একটি বড় অংশ বর্তমানে মোবাইল গেম, সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট এবং পর্নোগ্রাফি আসক্তির কারণে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি আসক্তির ফলে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ এর গঠনগত পরিবর্তন ঘটে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিচারবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে আচরণে তীব্র আবেগহীনতা এবং উগ্রতা প্রকাশ পায়, যা অনেক সময় পরিবারে সহিংসতা ও আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। এর বাইরেও সামাজিক চাপ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং এবং একাকিত্ব তরুণদের মানসিক বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটের অন্যতম প্রধান সামাজিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব এবং ক্যারিয়ারের চাপ। পড়াশোনা শেষ করে বছরের পর বছর চাকরি না পাওয়া এবং পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপ তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগ ব্যবস্থার জটিলতা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক যোগ্য তরুণ দীর্ঘস্থায়ী হতাশায় ভুগছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বকে অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে মূল্যায়ন করার কারণে তরুণদের ওপর মানসিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই সঙ্কট উত্তরণে বেকারত্ব ভাতা চালুর মাধ্যমে তরুণদের ন্যূনতম আর্থিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালটি ৪-শ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পূর্বের ২-শ শয্যার জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকার কারণে অনেক জরুরি থেরাপি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দায়িত্ব পালন করছেন, যা প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা চার শতাধিক রোগীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
একই সাথে সামাজিক কুসংস্কার বা ট্যাবু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। দেশে সোয়া দুই কোটিরও বেশি মানুষের পেশাদার মানসিক সেবা প্রয়োজন হলেও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। দেশে মাত্র ৩০০ জনের মতো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যাদের দুই-তৃতীয়াংশই রাজধানী কেন্দ্রিক। এই সঙ্কট দূরীকরণে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষাক্রম ও স্কুল-কলেজ পর্যায়ে মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় নীতিগত সংস্কার, বাজেট বৃদ্ধি এবং পারিবারিক সচেতনতাই পারে তরুণ প্রজন্মকে এই গভীর সঙ্কট থেকে রক্ষা করতে।