বিশেষ প্রতিবেদক
বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি মেটাতে সরকারকে এখনো ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান প্রশাসনকেও বহন করতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে চলমান মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ গ্রাহককে মুক্ত রাখতে সরকার সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেন মন্ত্রী।
শনিবার সকালে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি বিষয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও উপস্থিত ছিলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির বিভিন্ন কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী দিক ব্যাখ্যা করেন।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতীতে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অসম চুক্তি হয়েছে, তার সুদূরপ্রসারী খেসারত দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। এই খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও দুর্নীতির চক্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে আসা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। তবে বর্তমান সরকার খাতটিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ঘাটতির কারণে দাম বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর যেন এর বড় প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের জ্বালানি নীতির কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে সরকারের বিশেষ অনুরোধে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের এই জীবনযাত্রার ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক মূল্যবৃদ্ধির আওতামুক্ত থাকবেন।
জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অকটেন এবং পেট্রোলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হলেও, কৃষি ও গণপরিবহন খাতের সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে দ্বিতীয় দফায় ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত শাসনামলে সুনির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা ‘অলিগার্কদের’ ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশীয় গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান স্থবির করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতকে সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়, যা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল অঙ্কের এই ভর্তুকি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার করা এবং বিদ্যুৎ খাতের অপচয় রোধ করা সম্ভব হলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সরকার বর্তমানে বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।