বিশেষ প্রতিবেদক
তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশু-কিশোরসহ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৩১ মে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। দিবসটির এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল’ (এফসিটিসি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে এটি অনুসমর্থন এবং ২০০৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে এই আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একটি মাইলফলক।
তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও এর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, তামাক ও তামাকজাত পণ্যে বিদ্যমান নিকোটিন মানবদেহে মারাত্মক আসক্তি সৃষ্টি করে। বিড়ি, সিগারেট, ই-সিগারেট, জর্দা, গুলসহ যেকোনো ধরনের তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, বিভিন্ন ধরনের জটিল ক্যান্সার এবং ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ নানাবিধ অসংক্রামক ব্যাধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের মরণছোবল থেকে রক্ষা করতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কঠোর আইনি পদক্ষেপের বিবরণ দেন। তিনি জানান, শিশু-কিশোরদের তামাকের প্রলোভন থেকে দূরে রাখতে তামাকজাত দ্রব্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপস, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, নাটক ও চলচ্চিত্রসহ সব মাধ্যমে তামাকের পরোক্ষ প্রচারণাও এখন আইনের দৃষ্টিতে দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া, তামাক কোম্পানিগুলো যাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) আড়ালে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালাতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান এবং শিশু পার্কের চারপাশের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত পণ্য বিক্রির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। একই সাথে ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক ও নিকোটিনযুক্ত পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি কমাতে পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান এবং ধোঁয়াClass ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি আইনের কার্যকারিতা বাড়াতে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে, যার অন্যতম প্রধান অনুঘটক তামাক ও নিকোটিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘টোব্যাকো এটলাস ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ৯৯ হাজারের বেশি মানুষ অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।
তামাকের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করেন। উক্ত গবেষণা অনুযায়ী, তামাক ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা বাবদ অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ব্যয়, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং নতুন আইনি বিধিবিধানের মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তিনি একটি সুস্থ, কর্মক্ষম, মাদকমুক্ত ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও সর্বস্তরের জনগণকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।