আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সাথে চলমান উত্তেজনার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সম্প্রতি এক কূটনৈতিক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও এর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে। প্রমাণস্বরূপ তিনি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই সম্পন্ন হয়ে থাকে।
ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের অস্থিরতা ছাড়াও মার্কিন অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ আসবে তখন, যখন সেদেশে ঋণ ও গৃহঋণের (মর্টগেজ) সুদের হার ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানানো হয়, ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ঋণের খেলাপির হার বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের হুমকি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যতদিন বজায় থাকবে, ততদিন মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে এবং পরিস্থিতি চূড়ান্ত অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে।
এই বিষয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ মার্কিন নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে একটি কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত নতুন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ডেকে আনতে পারে। অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ৩০ বছর মেয়াদি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বন্ড পাঁচ শতাংশ সুদে বিক্রি করেছে, যা বিগত প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথম। এর পাশাপাশি দেশটির ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারও এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে এবং প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়বে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনায় বড় ধরনের অচলাবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ইরান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে নিজেদের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করছে। অপরদিকে, পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ এবং পশ্চিমা বিশ্ব এটিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এমতাবস্থায় ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের প্রধান এব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ইরান একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে। এই নীতি অনুযায়ী, ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার সাথে সহযোগিতাকারী জাহাজগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে পারস্য উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।