অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাবে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের লক্ষ্য নিয়ে আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকায়। গত বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০১ শতাংশ। বিপরীতে, একই সময়ে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত ধীর। আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আমদানি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোট আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ সম্পন্ন করেছে সরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠান— পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। মূলত জ্বালানি তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানিতে রাষ্ট্রীয় এসব প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এআরটি আলোচনার ধারাবাহিকতায় এবং ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুযায়ী এই আমদানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, আমদানিকৃত মোট ব্যয়ের ৮৩ শতাংশই ব্যয় হয়েছে প্রধান ১০টি পণ্যের পেছনে, যার সম্মিলিত মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। পেট্রোবাংলা চার মাসে ৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেছে। এছাড়া ওমেরা পেট্রোলিয়াম, সান গ্যাস ও ইউনাইটেড আইগাজ এলপিজি প্রায় ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকার এলপিজি সরবরাহ করেছে। উল্লেখ্য যে, গত বছর এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করা হয়নি।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি না করলেও চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার গম কেনা হয়েছে, যার সিংহভাগই এনেছে খাদ্য অধিদপ্তর। পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল মার্কিন তুলার আমদানি ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিমানের ইঞ্জিন আমদানিতে ব্যয় ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক মওকুফ করেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ শুল্ক ছাড়ের পদক্ষেপ। পর্যায়ক্রমে আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যের শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৬৩৮টি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নিলেও তন্তু, লোহা, ইস্পাত ও তৈরি পোশাকের ওপর গড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ শুল্ক বহাল রেখেছে। গত বছর বাণিজ্য ঘাটতির অজুহাতে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্ক বর্তমানে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতায় এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দেশটির সরকারের পারস্পরিক শুল্কনীতি বাতিল করে। এর আগে মালয়েশিয়া একই ধরনের চুক্তি অকার্যকর ঘোষণা করে। যদিও ট্রাম্প ট্রেড অ্যাক্টের আওতায় শুল্ক বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তবে গত ৭ মে নিউ ইয়র্কের একটি বিশেষায়িত ফেডারেল আদালত রায় দেয় যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত ঘাটতি না থাকায় এই কঠোর আইন প্রয়োগের ভিত্তি নেই।
অর্থনীতিবিদরা এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, চুক্তিতে কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালে বার্ষিক ন্যূনতম আমদানির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এর ফলে চাহিদার ভিন্নতা বা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের তারতম্য থাকলেও বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে বাধ্য থাকবে, যা দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বিষয়টিকে কৌশলগত প্রেক্ষাপট থেকে দেখছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হওয়ায় কৌশলগত কারণে ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। আমদানিকৃত পণ্যগুলোর অধিকাংশই অত্যাবশ্যকীয় হওয়ায় বাংলাদেশ আগে অন্য দেশ থেকে যা কিনত, এখন তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করছে। এর ফলে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় থাকলেও দেশীয় অর্থনীতির ওপর এর প্রকৃত প্রভাব নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।