অর্থনীতি প্রতিবেদক
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারা অনুযায়ী দেওয়া এক বিস্তৃত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং সব নাগরিকের জন্য সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতে চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণে সরকার ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে এবং পর্যায়ক্রমে সব পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষক, জেলে ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য পৃথক কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কৃষি খাতে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কৃষিঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত সম্প্রসারণ, অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ব্লু ইকোনমি উন্নয়ন, ইকো-ট্যুরিজম এবং আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে “ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ” ব্র্যান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব খাত সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও অটোমেশন নিশ্চিত করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ঋণনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাত সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার জ্বালানি সাশ্রয়, প্রশাসনিক সময় সমন্বয়, বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার কার্যক্রমের সময়সূচি পুনর্বিন্যাসসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি উৎস উন্নয়নের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হচ্ছে এবং জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি তেলের দাম আপাতত স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়, তবে কার্যকর নীতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত শক্তিশালী করা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বিবৃতির শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।