রাজনীতি ডেস্ক
মানবপাচার রোধে অপরাধীচক্রের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে কঠোর আইন প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দেশে আইনের শাসন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকলে এ ধরনের অপরাধীচক্র কখনো শক্তিশালী হতে পারত না। তাই মানবপাচার বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ভবনের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আলোচনায় মানবপাচারের নানামুখী কারণ ও সামাজিক পরিণতি তুলে ধরে রুহুল কবীর রিজভী বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। প্রান্তিক জনগণের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সমাজ কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নতুন রূপের দাসত্ব ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানুষ বিভিন্নভাবে এই অপশক্তির শিকার হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসনের অভাব থাকায় প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অবিচার ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। দেশের অর্ধাশিক্ষিত ও নিরক্ষর সাধারণ মানুষ প্রায়শই স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সঠিক নিয়মে যোগাযোগ করতে পারেন না এবং নিজেদের ন্যায্য দাবিদাওয়ায় ব্যর্থ হন। প্রশাসনের এই দূরত্বের সুযোগ নিয়ে ফড়িয়া ও দালালচক্র অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে যেতে গিয়ে শত শত মানুষ এই প্রতারকচক্রের ফাঁদে পা দেয়। প্রবাসে গিয়ে বা পথিমধ্যে আইনগত জটিলতায় পড়ে তারা যখন সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরত আসে, তখন পরিবারগুলো চরম দেউলিয়া ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
বক্তব্যে মানবপাচারকে আধুনিক যুগের ‘দাসপ্রথা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করে রিজভী বলেন, রাষ্ট্রহীনতা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং ক্রমাগত বাস্তুচ্যুতি মানবপাচার বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ। এছাড়া বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার অপর্যাপ্ততা মানবপাচারকে আরও উসকে দিচ্ছে। বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে কম বয়সে সন্তানসম্ভবা হওয়া নারী ও কিশোরীরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে তাদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় না, যা পরবর্তীতে তাদের পাচারকারীদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করে।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সমাজের অনগ্রসর ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের সুস্পষ্ট দায়বদ্ধতা থাকা আবশ্যক উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের তুলনায় তৃতীয় বিশ্ব বা বিকাশমান উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই মানবপাচারের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। এই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় অপরাধীদের পরিচয় বিবেচনা না করে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। সমন্বিত আইনি কাঠামো এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধের বিস্তার থামানো সম্ভব।