বিশেষ প্রতিবেদক
সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় তা ভোগ-দখলের পূর্ণ অধিকার বাবা-মায়ের হাতে রাখার আইনি বিধান যুক্ত করে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ সংশোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন এই প্রস্তাবিত আইন প্রণীত হলে সন্তানকে হেবা বা দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে। একই সঙ্গে সরকারের আশা, এ পদক্ষেপে দেশের আদালতগুলোতে বিদ্যমান বিপুলসংখ্যক দেওয়ানি বা পারিবারিক মামলার জট উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারের এই নীতিগত পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেন।
বিদ্যমান আইনি কাঠামোর জটিলতা ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রচলিত মুসলিম আইনের হেবা, হিন্দু আইনের উইল বা মুসলিম আইনের ওয়াসিয়তনামার মাধ্যমে বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর করার সঙ্গে সঙ্গেই আইনগতভাবে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে পরবর্তী সময়ে সন্তান যদি তাদের ভরণপোষণ বা যত্ন না নেয়, তবে বাবা-মা চরম আইনি ও সামাজিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। এতে পরিবারগুলোতে বিরোধ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলায় রূপ নেয়। দেশে চলমান দেওয়ানি মামলার একটি বিরাট অংশই এ জাতীয় সম্পত্তি বণ্টন, হিসাব-নিকাশ ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্ট।
এই সামাজিক ও আইনি সংকট নিরসনে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’ (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন)-এ পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ বা জীবনস্বত্বের নীতি অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। নতুন এই বিধান চালু হলে হেবা বা সাধারণ দানপত্রের বাইরে গিয়েও বাবা-মা সন্তানের নামে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দিতে পারবেন, তবে শর্ত থাকবে যে নিজেদের জীবদ্দশায় তারা সেই সম্পত্তি ভোগ-দখলে রাখবেন।
আইনটির অধীনে পারস্পরিক সুরক্ষারও বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, বাবা-মায়ের জীবনদ্দশায় দুই পক্ষের যৌথ সম্মতি ছাড়া উক্ত সম্পত্তি কোনোভাবেই বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। অর্থাৎ, সন্তান যেমন একতরফাভাবে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না, তেমনি বাবা-মাও একক সিদ্ধান্তে তা বিক্রি করতে পারবেন না।
তবে জরুরি ও বিশেষ মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আইনে শিথিলতার সুযোগ রাখা হচ্ছে। কোনো জরুরি মুহূর্তে—যেমন বাবা বা মায়ের জটিল চিকিৎসার খরচ জোগাতে সম্পত্তি বিক্রি করা অপরিহার্য হয়ে পড়লে এবং সন্তান তাতে সম্মতি না দিলে—বিষয়টি নিষ্পত্তির আইনি এখতিয়ার দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট জেলা জজকে। জেলা জজের কাছে আবেদন জানানো হলে তিনি পরিস্থিতির সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
জনকল্যাণমূলক এই আইন সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রী ব্যক্ত করেন যে, জনগণের সুরক্ষা ও সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে সরকার আইনি কাঠামোতে প্রয়োজনীয় যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নতুন এই সংশোধনী বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন প্রবীণ বাবা-মায়ের মৌলিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দেওয়ানি মামলা দায়েরের হার ব্যাপকভাবে কমে আসবে।