আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় দামিয়েত্তা বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণকারী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ হামলার ফলে বন্দরে নোঙর করে রাখা দুটি ট্যাংকারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা আমব্রে এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে বিস্তৃত হওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্দর ও বাণিজ্যিক সূত্রগুলোর প্রদত্ত তথ্যমতে, ড্রোনটি সরাসরি ‘এনারগোস উইন্টার’ নামক মার্কিন মালিকানাধীন একটি ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনর্গঠন ইউনিটে (এফএসআরইউ) আঘাত হানে। ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই জলযানটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এনারগোস ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ও ‘উইলহেলমসেন শিপ ম্যানেজমেন্ট’। ড্রোনটির আঘাতে জলযানটিতে তাত্ক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন পাশে থাকা ‘গ্যাসলগ সালেম’ নামের অপর একটি লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকারে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, অজ্ঞাত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন আঘাত হানার পর ফায়ার সার্ভিস ও কারিগরি দলের যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সক্ষম হয়।
এদিকে মিসরের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে দামিয়েত্তা বন্দর এলাকায় দুটি গ্যাস রূপান্তর ও সংরক্ষণকারী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশটির পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী করিম বাদাউই স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার তৎপরতা তদারকি করেন। মিসরীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে অগ্নিকাণ্ডে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে বিবৃতিতে অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করা হয়নি। সামুদ্রিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা ইনচকেপও দুটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সংবাদ প্রচার করেছে।
উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্র, জাহাজের চলাচলের ডেটা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো ঘটনাটির সত্যতা ও দুর্ঘটনাস্থল নিশ্চিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলযানগুলোর গঠন, মাস্তুল ও আশপাশের বন্দরের অবকাঠামো যাচাই করে দেখা গেছে যে আক্রান্ত জাহাজ দুটি আসলেই ‘এনারগোস উইন্টার’ এবং ‘গ্যাসলগ সালেম’।
যদিও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিবিদ ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বহুমুখী সংঘাতের ধারাবাহিকতাতেই এই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। সম্প্রতি জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার জবাবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পরপরই মিসরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরে এই জলযানে আঘাত হানা হলো। তাছাড়া, লোহিত সাগরে চলাচলের ওপর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নতুন করে সামরিক অবরোধ আরোপ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে গভীর চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
জরুরি ও কারিগরি দলগুলো বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত জলযান দুটির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছে এবং বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। সুয়েজ খালের প্রবেশপথ সংলগ্ন কৌশলগত এই সমুদ্রসীমায় ড্রোন হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে এলএনজি পরিপোহন এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের সুরক্ষায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।