আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নিজেদের জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষা এবং সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকে সক্রিয় আধাসামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের’ (পিএমএফ) একাধিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এই বিমান হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় নিনেভেহ প্রদেশে পিএমএফের অন্তত আটজন সদস্য নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় বাসরা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এ সামরিক অভিযানকে ইরাকের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে নতুন করে উসকে দেওয়ার আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় সামরিক সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিমান হামলায় মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরাকের নিনেভেহ প্রদেশের সামরিক অবকাঠামো এবং বাসরা অঞ্চলের পিএমএফ অপারেশনস কমান্ডের সদর দফতর। আক্রমণের পরপরই বাসরা ও নিনেভেহের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ও জরুরি উদ্ধারকারী দল পৌঁছায়। হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার নিচে বেশ কয়েকজন আটকে থাকার আশঙ্কায় সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করে উদ্ধার তৎপরতা বহাল রাখা হয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে যৌথ এই অভিযানের কথা স্বীকার করে জানায়, পূর্ব ইরাকে অবস্থিত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র দলগুলোর একাধিক সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিখুঁত নিশানাভিত্তিক আঘাত হানা হয়েছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, গত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নির্দেশনায় ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই ধারাবাহিক আক্রমণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই যৌথ বিমান বাহিনী কৌশলগত এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
মার্কিন সামরিক নথির তথ্যানুসারে, গত কয়েক মাসে মার্কিন ও সৌদি আরবের বেসামরিক নাগরিক এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে নিশানা করে ছয় শতাধিক ভিন্ন ভিন্ন আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। সেন্ট্রাল কমান্ড এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, মার্কিন ও সৌদি স্বার্থের ওপর এ ধরনের প্রক্সি হামলা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত থাকবে। পরবর্তীতে যেকোনো সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনতিবিলম্বে সব ধরনের সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সেন্টকম।
অন্যদিকে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স এই হামলাকে একটি ‘মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ উস্কানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পিএমএফ জানিয়েছে, যেহেতু তারা ইরাক সরকারের অফিশিয়াল নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি স্বীকৃত অংশ, তাই দেশটির ভূখণ্ডে বাইরের কোনো শক্তির যৌথ হামলা জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অফিশিয়াল নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি আঘাতের শামিল। হামলার ফলে সৃষ্ট বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব বের করার পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ছায়াযুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি মার্কিন বাহিনীর সাথে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। ইরাকের সার্বভৌমত্বের ভেতরে বাইরের দেশের এই যৌথ সামরিক অভিযান প্রক্সি সংঘাতের মাত্রাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। এতে কেবল ইরাক বা সৌদি আরব নয়, পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল ব্যবস্থার ওপর তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ না হলে এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।