অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের জেরে এশীয় বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সম্ভাব্য বৈরী প্রভাব থেকে অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষিত রাখতে এবং জ্বালানি ঘাটতি নিরসনে বাংলাদেশ সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে রেকর্ড প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক তেল বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাজার লেনদেনের নির্ধারিত সময়ে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯২ দশমিক ০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ দর। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট) মানদণ্ডের তেলের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৩ ডলারে উন্নীত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে মূল তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলা বা সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বের কৌশলগতভাবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’। যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটে এই পথটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাত্ক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী অতিক্রম করে বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হতো। ফলে আঞ্চলিক সামরিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী ও আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা চরম রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সার্বিক প্রভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন কোনো প্রকার জ্বালানি সংকট বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে আগাম সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিএপিএম) এক বৈঠকেই বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) যৌথ বৈঠকে আমদানির এই প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তড়িৎ ও কৌশলগতভাবে এই পরিমাণ ডিজেল আমদানির পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাত এবং কৃষিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তবে জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক সরবরাহ পর্যবেক্ষণ নিশ্চিতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।