প্রবাস ডেস্ক
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত অবস্থায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মিল্লাত হোসেন (৪২) নামের এক বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ১০ তলা থেকে দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে গিয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত মিল্লাত হোসেন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার লামচর ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকার মুন্সিবাড়ির প্রয়াত আব্দুর রশিদের ছেলে। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে নিজের পরিবার ও স্বজনদের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর তাগিদে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী কর্মী হিসেবে সততার সাথে কাজ করে আসছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতোই বুধবার সকালে কুয়ালালামপুরের ওই নির্মাণাধীন ভবনে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করছিলেন মিল্লাত। কাজের একপর্যায়ে ভবনের ১০ তলার ওপর থেকে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান তিনি। উপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ফলে তিনি মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই সহকর্মীরা পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলকে খবর দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জরুরি সেবা বিভাগ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং স্থানীয় একটি সরকারি হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে।
নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বড় ভাই শরীফ হোসেন দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করে জানান, কর্মস্থলে তাঁর ভাইয়ের মর্মান্তিক পরিণতির কথা সহকর্মীদের মাধ্যমে দেশে পৌঁছায়। জীবিকার তাগিদে প্রবাসে গিয়ে এমন অকাল মৃত্যুর সংবাদ আসার পর থেকেই নিহতের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে শোকাকুল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনরা নিহত শ্রমিকের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান জানান, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসে কর্মরত একজন সাধারণ শ্রমিকের এভাবে প্রাণহানি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি আশ্বাস দেন যে, মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করে নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার কাজে পরিবারটিকে যাবতীয় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বহু বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক প্রধানত নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মরত রয়েছেন। বিশেষ করে নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত উঁচু বহুতল ভবনগুলোতে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার ও সার্বিক নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা অত্যন্ত আবশ্যক। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো শিথিলতা বা কারিগরি ত্রুটি থাকলে প্রায়শই জীবনঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে প্রতিনিয়ত তাগিদ দিয়ে আসছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণত বিদেশে কোনো প্রবাসী কর্মী দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর মৃতদেহ স্বদেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্থানীয় কনস্যুলার সেবার মাধ্যমে মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহ পৌঁছানোর পর ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য প্রাথমিক অনুদান দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বিধিমালা অনুযায়ী নিহতের পরিবার এককালীন নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভের আবেদন করতে পারে।
নিহত মিল্লাত হোসেনের কফিনবন্দী দেহ যেন কোনো প্রকার দীর্ঘসূত্রতা ছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, সেজন্য লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন স্বজন ও স্থানীয় এলাকাবাসী।