ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপ ফুটবলের মেগা ফাইনালে পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজ জন্মশহর রোসারিওতে ফিরেছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা লিওনেল মেসি। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৬টার দিকে স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ একটি ব্যক্তিগত বিমানে করে তিনি রোসারিও বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং টুর্নামেন্ট পরবর্তী দীর্ঘ সফর শেষে তিনি সেখানে নিজের ব্যক্তিগত বাসভবনে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বিমানবন্দরে অবতরণের পর অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মেসির পরিবারকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ফুটেজে দেখা যায়, ধূসর রঙের একটি এসইউভি গাড়িতে চেপে তিনি ফুনেস শহরের একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত সংরক্ষিত আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করেন। রোসারিও শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই বিশেষ আবাসিক এলাকাতেই মেসির নিজ মালিকানাধীন বিলাসবহুল বাসভবন রয়েছে। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন বা ইউরোপীয় ও আমেরিকান ক্লাব ফুটবলের ছুটির সময় তিনি সাধারণত এই বাড়িতেই অবস্থান করে থাকেন।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় এবং প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি সোমবার রাতে রাজধানী বুয়েনস আইরেসে পৌঁছান। বুয়েনস আইরেসের এজেইজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দলের অবাতরণের সময় হাজার হাজার ভক্ত ও সমর্থক সমবেত হন। যদিও দল এবার শিরোপা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, তবুও সমর্থকদের মধ্যে বিন্দুমাত্র উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। জাতীয় পতাকা উড়িয়ে, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে এবং আবেগঘন স্লোগানের মাধ্যমে সমর্থকেরা তাদের প্রিয় ফুটবলারদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সমর্থকদের এই উপস্থিতি দলের প্রতি দেশের মানুষের অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বিশ্বকাপের এবারের আসরের ফাইনাল ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও নাটকীয়তায় ভরা। ফাইনালে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হয়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গোটা ম্যাচে দুই দলই সমান তালে লড়াই চালালেও ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের শেষভাগে স্পেন ১-০ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয়। এই পরাজয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয় স্পর্শ করেছে।
বয়সের ভার এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের শারীরিক ও মানসিক চাপ সত্ত্বেও এবারের বিশ্বকাপে মেসির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মোট আটটি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে একাধিক গোল করান। তার গতিশীল আক্রমণাত্মক খেলা এবং বুদ্ধিমত্তা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনার প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও বিশ্বমঞ্চে এই ধরনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বজায় রাখা একজন ক্রীড়াবিদের অসামান্য পেশাদারিত্ব ও নিবেদনের পরিচয় বহন করে।
এই বিশ্বকাপের পর লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এটিই ছিল বিশ্বমঞ্চে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক কোনো বড় টুর্নামেন্ট। তবে তার এই প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। রোসারিওতে নিজের পরিবারের সাথে কিছুদিন সময় কাটিয়ে এবং মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠে তিনি হয়তো তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ও ইন্টার মায়ামির হয়ে পরবর্তী ক্লাব মরসুমের বিষয়াবলী নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসির অবদান এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলে তার নেতৃত্বের প্রভাব চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। বুয়েনস আইরেস থেকে রোসারিও পর্যন্ত আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মাঝে এখন একটাই আলোচনা—তাদের প্রিয় অধিনায়কের এই দীর্ঘ ও গৌরবময় যাত্রার পরবর্তী অধ্যায় কী হতে যাচ্ছে। নিজ শহরের নিরিবিলি পরিবেশে পরিবারের সাথে কাটানো এই সময়টুকু হয়তো তাকে নতুন করে ভাবার এবং ক্যারিয়ারের শেষ ভাগের পথচলা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করে দেবে।