আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাষ্ট্রীয় সফরে ইরাকে অবস্থান করছেন ইরানের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার (৮ জুলাই) ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় প্রয়াত এই নেতার জানাজার মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে ইরাকে বুধবার এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।
এর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে সেখানে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদিসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। জানাজার মিছিলে লাখ লাখ শিয়া মুসলমান ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নেবেন বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান কেবল এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতেই ইরাকে যাননি, বরং সফরটিকে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সফরের অংশ হিসেবে বাগদাদে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন ইরানের রাষ্ট্রপতি। বৈঠকে জানাজা ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের সুশৃঙ্খল ও চমৎকার আয়োজনের জন্য ইরাকি সরকার ও জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বৈঠকে ইরানের রাষ্ট্রপতি ইরাকের এই আতিথেয়তাকে দুই দেশের মধ্যকার গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের অনন্য প্রতিফলন এবং ইসলামী সংহতির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন। দুই দেশের কৌশলগত ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো গতিশীল ও গভীর করতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে তেহরান সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান পেজেশকিয়ান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের রাষ্ট্রপতি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে পশ্চিমা শক্তি বা যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তবে ইরান কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন বা প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক সমঝোতা থেকে কখনো বিচ্যুত হবে না বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্য দিকে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বলেন, ইরাকি সরকার ও সাধারণ জনগণের জন্য প্রয়াত নেতা খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণ করা একটি নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। তিনি প্রয়াত ইরানি আধ্যাত্মিক নেতাকে ‘ইসলামী বিশ্বের একজন রূপান্তরকারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতি এবং অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ইরাক সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রয়াণ-পরবর্তী এই রাষ্ট্রীয় সফর এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে থাকা ইরানের জন্য ইরাকের মতো কৌশলগত প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের যৌথ সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই সফরের মাধ্যমে।