অর্থনীতি প্রতিবেদক
দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমায় গত জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। তবে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যচাপ এখনো উচ্চ স্তরেই অবস্থান করছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে জাতীয় পর্যায়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে। এর আগের মাস, অর্থাৎ মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। মূলত চাল, ডাল, তেল ও কিছু মরসুমি সবজির বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে খাদ্য খাতে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, জুন মাসে তা ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে থাকা সাধারণ ও সীমিত আয়ের ভোক্তাদের জন্য খাদ্য খাতের এই পতন সাময়িক স্বস্তি বয়ে এনেছে। বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্যের বাজার স্থিতিশীল থাকায় সামগ্রিক খাদ্য সূচক নিম্নমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত উপখাতে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের গতি অত্যন্ত ধীর। মে মাসে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা জুন মাসে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই খাতে মূল্যস্ফীতি মাত্র শূন্য দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। পরিবহন খরচ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রীর বাড়তি দাম এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতের ব্যয় অপরিবর্তিত বা ঊর্ধ্বমুখী থাকায় এই উপখাতে মূল্যচাপ এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসা এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নির্দেশ করে যে, দেশের অভ্যন্তরে সামগ্রিক উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় এখনো অনেক বেশি। বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি করা কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে হলে কেবল খাদ্যপণ্যের সরবরাহের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাজারে সরবরাহ চেইন বা বিপণন ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি মুদ্রা নীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সাথে বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা আবশ্যক। খাদ্যবহির্ভূত খাতের চাপ কমাতে জ্বালানি ও পরিবহন খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।