আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হেফাজতে থাকা সাবেক অসামরিক সরকারপ্রধান অং সান সু চি প্রথমবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। রাজধানী নেপিডোতে আইসিআরসির মিয়ানমার প্রতিনিধি আর্নড ডি বেকের সঙ্গে সাবেক এই রাজনৈতিক নেত্রীর এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে সু চির শারীরিক অবস্থা ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে সোমবার সরকারের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র খাইন খাইন সো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সামরিক হেফাজতে থাকা ৮১ বছর বয়সী অং সান সু চি নেপিডোতে আইসিআরসি প্রতিনিধির মুখোমুখি হন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুতির পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেলেন। তবে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বিস্তারিত বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেতা অং সান সু চি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দি রয়েছেন। সে বছর তাঁর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নির্বাচিত অসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। ক্ষমতার এই রদবদলের পর থেকেই পুরো মিয়ানমারজুড়ে চরম রাজনৈতিক সংকট, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই সু চিকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অজ্ঞাত স্থানে বা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে রাখা হয়। দীর্ঘ চার বছরে কোনো বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি কিংবা সংবাদমাধ্যমকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি সু চির শারীরিক অবস্থা এবং তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর সংশয় ও জল্পনা তৈরি হয়। সু চির ছেলে কিম আরিস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে তাঁর মায়ের সুস্থতা ও বেঁচে থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের জন্য ধারাবাহিক আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ওই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাবেক জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখার ঘোষণা দেয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন রাখার পর সু চির সঙ্গে রেড ক্রসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধির এই সাক্ষাৎ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জান্তা সরকারের ওপর বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর ক্রমাগত চাপ কমানোর অংশ হিসেবেই এই সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে সু চির স্বাস্থ্যের বিষয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, এই পদক্ষেপ তার একটি সাময়িক বার্তা বহন করে। তবে এই সাক্ষাতের মাধ্যমে মিয়ানমারের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে কতটা অগ্রগতি হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।