আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন কূটনৈতিক রূপরেখা ঘোষণার পরপরই গাজাজুড়ে আবারও বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই সামরিক অভিযানে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বাধিক প্রাণহানির ঘটনা। গাজার পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং উত্তরাংশের বিভিন্ন আবাসিক ভবন, আশ্রয়কেন্দ্র ও চিকিৎসা গুদামকে লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর উপস্থিতিতে শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটেও ভূমিতে সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপত্যকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে।
স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পশ্চিম গাজার আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে পরিচালিত বিমান হামলায় ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, তাঁর ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী শিশুসন্তান নিহত হন। অপরদিকে, খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমের আল-কারারা এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে চালানো হামলায় এক পরিবারের তিন সদস্য প্রাণ হারান এবং অপর তিনজন মারাত্মকভাবে আহত হন। আক্রান্তদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নাসের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। একই দিনে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ সংলগ্ন একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক প্রবীণ দম্পতি নিহত হন এবং একই এলাকায় মোটরসাইকেলে অবস্থানকালে পরিবারের দুই ভাই প্রাণ হারান।
সংঘাতের তীব্রতা গাজার উত্তরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে চালানো হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং গাজা শহরের পশ্চিমে অবস্থিত রেমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুত বেসামরিক নাগরিকদের একটি তাঁবুতে পরিচালিত ড্রোন হামলায় এক শিশু সহ দুজন প্রাণ হারান। এছাড়া গাজার একটি বেসামরিক যানবাহনে বোমাবর্ষণে চারজনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, দেইর আল-বালাহতে অবস্থিত আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের সংলগ্ন কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণে থাকা ওষুধ ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখার গুদামে বিমান হামলা চালিয়ে দুটি স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং আরও দুটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই ঘটনাকে স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিত আঘাত এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহে বাধার সৃষ্টি হিসেবে দেখছেন।
এই সামরিক অভিযানের ঠিক একদিন আগে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী এবং প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বোর্ডের কাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পর্যায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেশকৃত এই বিশদ প্রস্তাবনার ওপর আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। জানা গেছে, ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস এই প্রস্তাবিত চুক্তির একটি রূপরেখা গ্রহণে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। তবে প্রস্তাবনার নীতিগত বিষয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর আলোচনা চললেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি।
কাতার, মিশর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়েছে, উক্ত চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকায় ধারাবাহিক অভিযানে অন্তত ১ হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪ হাজার ৫৩ জন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন। উপত্যকাজুড়ে খাদ্য, পানীয়, বিদ্যুৎ এবং জরুরি ওষুধের মারাত্মক সংকট বিদ্যমান থাকা অবস্থায় এই নতুন হামলা মানবিক পরিস্থিতিকে আরও বিপর্যয়কর করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনার সমান্তরালে গাজায় আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া ভূ-রাজনৈতিক জটিলতাকে বাড়িয়ে তুলছে। প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।