আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনা এবং সামরিক চাপ—উভয় পথই খোলা রাখার বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেহরানের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ আলোচনা ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে এবং একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় পৌঁছানোর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে কিংবা সমঝোতা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযানে ফিরে যেতে প্রস্তুত রয়েছে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৭ জুলাই) সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের এই সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের মতে, সম্প্রতি ওয়াশিংটনের গৃহীত কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণেই ইরান পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, শক্ত প্রতিরোধ গড়ে না তুললে তেহরান বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহী হতো না। তবে আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না আসলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট ধরন কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
একই সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাবও মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, রাশিয়া ইরানকে মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে সহযোগিতা করছে। এই অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, বিষয়টি নিয়ে রুশ নেতৃত্বের সাথে সরাসরি কথা বলা হবে। বিষয়টি পর্যালোচনার পরই উক্ত অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করে মার্কিন প্রশাসন।
ইরান কেন্দ্রিক এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টির দিকেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন অবস্থানের তুলনা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, অধিকাংশ ভূরাজনৈতিক বিষয়ে দুই দেশের সামরিক ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন হলেও কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে।
হোয়াইট হাউস সূত্রের তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। ওই বৈঠকে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকি, লেবানন সীমান্তে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থার ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথেও পৃথক এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার কথা রয়েছে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের, যেখানে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিরসনে আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও পাল্টা হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতির জবাবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ব্যবহৃত একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখে।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের পর গত তিন দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি অস্থায়ী ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আবহ বজায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক উদ্যোগ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা নিরসনে ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহল।