স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশে মশাবাহিত এডিস ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ আবার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৫৩৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন। এর মাধ্যমে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক দিনে নতুন করে প্রাণ হারানো ৩ জনের মধ্যে এক জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, এক জন বরিশাল বিভাগে এবং এক জন ময়মনসিংহ বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অন্যদিকে, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশন ব্যতীত)। গত এক দিনে এই বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সর্বমোট ১৩১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ডেঙ্গুর বিস্তার ছড়াচ্ছে। বিজ্ঞপ্তির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৭১ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯৬৫ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫৬ জন, খুলনা বিভাগে ৪৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩০ জন, রংপুর বিভাগে ২৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে মশাবাহিত এ রোগে মৃত্যু এবং সংক্রমণ—উভয়ই ঊর্ধ্বমুখী। বিজ্ঞপ্তির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, প্রাণহানির বড় অংশই ঘটেছে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের অঞ্চলে। দুই সিটি করপোরেশনসহ এককভাবে ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন ২৩ জন রোগী। ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগের মধ্যে ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ৬ জন করে মোট ১৮ জন মারা গেছেন। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩ জন এবং রংপুর বিভাগে ১ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এডিস মশার প্রজনন তীব্র আকার ধারণ করে। বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এবং নির্মাণাধীন ভবনের অরক্ষিত জলাশয়ে এই মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। চলতি বছর জুলাই মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টিপাতের ধারাবাহিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালে নির্ধারিত সময়ে না আসা এবং চিকিৎসায় বিলম্ব হওয়াকেও অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন চিকিৎসকরা।
দেশের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পূর্ববর্তী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সরকারি হিসাব অনুসারে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং রেকর্ড ১,৭০৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। বর্তমান বছরের সংক্রমণের ধারা অব্যাহত থাকলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নগর কৃর্তপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বাসাবাড়ির চারপাশে জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি জমা না রাখা, নিয়মিত মশকবিরোধী ওষুধ ছিটানো এবং রাতে বা দিনে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা। যেকোনো ধরনের টানা জ্বর, গায়ে ব্যথা বা রক্তপাতের উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1) করার এবং নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।