ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপ ফুটবলের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে ২০৩০ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বমঞ্চে সরাসরি মাঠে নামবে ছয়টি দেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার (ফিফা) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো ধরনের আঞ্চলিক বাছাইপর্ব না খেলে সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাবে আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার মোট ছয়টি ফুটবল দল। প্রধান যৌথ আয়োজক তিন দেশ স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর পাশাপাশি প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতিবিজড়িত তিন লাতিন আমেরিকান দেশ উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েকে এই বিশেষ স্বাগতিক কোটা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের তিনটি মহাদেশ জুড়ে একই আসর বিস্তৃত হওয়ার মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা রূপ নিতে যাচ্ছে।
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে আয়োজিত হয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের প্রথম প্রতিযোগিতা। সে বছরের আসরে উরুগুয়ে বিজয়ী এবং আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (কনমেবল)-এর ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে প্যারাগুয়ে প্রথম থেকেই ফুটবল সংস্কৃতির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। এই ঐতিহাসিক পটভূমি এবং টুর্নামেন্টের শতবর্ষ স্মরণে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা এক নজিরবিহীন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ আসরের উদ্বোধনী পর্বের বিশেষ তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার তিন দেশ উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। উদ্বোধনী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে মন্টেভিডিওর ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে, যেখানে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার উদ্বোধনী পর্বের সমাপ্তির পর টুর্নামেন্টের মূল কার্যক্রম স্থানান্তরিত হবে প্রধান তিন স্বাগতিক দেশ স্পেন, পর্তুগাল এবং মরক্কোতে। ইউরোপীয় ফুটবলের দুই ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তি স্পেন ও পর্তুগাল এবং উত্তর আফ্রিকার ফুটবল শক্তি মরক্কো যৌথভাবে টুর্নামেন্টের মূল অংশের আয়োজকের ভূমিকা পালন করবে। তিন দেশের একাধিক আধুনিক শহর জুড়ে বিস্তৃত হবে টুর্নামেন্টের অধিকাংশ ম্যাচ। ফিফার প্রদত্ত বিশেষ স্বাগতিক মর্যাদার কারণে এই তিন দেশকে নিজ নিজ মহাদেশীয় বাছাইপর্বে অংশ নিতে হচ্ছে না। সরাসরি টুর্নামেন্টের মূল পর্বে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় দলগুলো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়ার সুবিধা পাবে।
আয়োজক দেশগুলোর ফুটবল অবকাঠামো ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে ফিফা ইতোমধ্যে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ভেন্যু প্রাথমিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভেন্যুগুলোর মধ্যে ইউরোপের বিখ্যাত ফুটবল ভেন্যু স্পেনের ক্যাম্প ন্যু ও সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, পর্তুগালের এস্তাদিও দা লুজ এবং মরক্কোর প্রস্তুতকৃত আধুনিক হাসান-২ স্টেডিয়াম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া লাতিন অংশের ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল ও উরুগুয়ের এস্তাদিও সেন্টেনারিও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। বিশ্বমানের এই ভেন্যুগুলো ক্রীড়াবিদদের জন্য উন্নত ক্রীড়া পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শকদেরও আকর্ষণ করবে।
আয়োজনের এই ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে ফুটবল বোদ্ধা ও ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মধ্যে বৈচিত্র্যময় পর্যবেক্ষণ দেখা গেছে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দলগুলোকে ভ্রমণ করে পরবর্তীতে ইউরোপ ও আফ্রিকায় মূল পর্বের ম্যাচগুলোতে অংশ নিতে হবে, যা দূরত্বের কারণে অ্যাথলেটদের শারীরিক সামর্থ্য ও সময়ের সমন্বয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। তা সত্ত্বেও, তিনটি মহাদেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধন জোরদারে ফিফার এই উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের অতীত ইতিহাস ও আধুনিকায়নের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে ফুটবলের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করাই এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সর্বোপরি, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ কেবল মাঠের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এটি ফুটবল বিশ্বের এক শতাব্দীব্যাপী ঐতিহ্য উদ্যাপনের রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাগতিক কোটায় ছয়টি দেশের সরাসরি অংশগ্রহণ আঞ্চলিক বাছাইপর্বের মূল সমীকরণে প্রভাব ফেললেও, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের আবেদন অক্ষুণ্ণ রাখাই এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।