আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলমান সাময়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে ইরান। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রধান অগ্রাধিকার হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ওআরএফ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, পাকিস্তান ও কাতারসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। দ্বিপাক্ষিক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে এবং আলোচনার পথ খোলা রাখতে এ ধরনের কূটনৈতিক মধ্যস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ওয়াশিংটনের সাথে পরোক্ষ যোগাযোগ চললেও দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তেহরান বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত সমঝোতা স্মারক প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়া ইসমাইল বাঘাই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত শর্তাবলী ও সময়সীমা ইরান অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলছিল। কিন্তু নির্ধারিত ৩০ দিনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে অবস্থান পরিবর্তন করে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় সংঘটিত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ও কথিত নৌ-ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ওয়াশিংটন ইরানের ভূখণ্ড ও স্বার্থে নতুন করে সামরিক হামলা পরিচালনা করে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
ইরানি মুখপাত্র আরও বলেন, এটি কোনো একক ঘটনা নয়। বিগত এক বছরের মধ্যে অন্তত তিনবার দেখা গেছে যে, যখনই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা বা উত্তেজনা প্রশমনের কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আলোচনার টেবিল সচল থাকা অবস্থাতেই সামরিক আক্রমণ পরিচালনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সদিচ্ছা এবং তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের বিশ্বস্ততা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বারবার এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা রাখা তেহরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সমঝোতা স্মারকের আর্থিক দিকসমূহ তুলে ধরে বাঘাই অভিযোগ করেন, দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার অন্যতম প্রধান অংশ ছিল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ও অর্থ মুক্ত করে দেওয়া। ওয়াশিংটন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ওয়াশিংটন তাদের প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসের খাতকে আরও গভীর করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কৌশলগত জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ববাজারে পরিবাহিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া মানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া। সার্বিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, পক্ষগুলো আন্তর্জাতিক স্তরে পরোক্ষ যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী।
তবে অবিশ্বাসের আবহে এবং আলোচনার সমান্তরালে সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকায় কূটনৈতিক সমাধান পৌঁছানো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিলেও দেশের আত্মরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।