আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মাথায় প্রথম কোনো বিদেশি নেতা হিসেবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আতিথ্য দিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। স্থানীয় সময় সোমবার অনুষ্ঠিত এ দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রধান উদ্দেশ্য কিয়েভের প্রতি লন্ডনের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন আরও জোরদার করা এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুক্তরাজ্যের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা।
লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট সূত্রে জানা গেছে, সফরকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট যৌথভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি পরিদর্শন করবেন। সেখানে তারা যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণে নিয়োজিত প্রায় ২০০ ইউক্রেনীয় সেনা ও নৌসদস্যের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন। উক্ত সামরিক সদস্যরা গত তিন সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ ভূখণ্ডে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও মাইন সনাক্তকরণ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। প্রধানত কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের নৌ-প্রতিরক্ষা জোরদার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি হিসেবে এ বিশেষ মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম জানান, দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক প্রাতিষ্ঠানিক বার্তায় তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সমর্থন অবিচল থাকবে। একটি দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এ সফরের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন এক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে সফলভাবে পরীক্ষা করা ‘স্টোন ক্লোক’ নামক একটি অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির মেধাস্বত্ব (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) ইউক্রেনকে হস্তান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে লন্ডন। আকার ও আয়তনে একটি সাধারণ ট্যাবলেট কম্পিউটারের মতো দেখতে এ সামরিক জ্যামারটি ড্রোন প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়। এটি ব্যবহারের ফলে ড্রোন চলাচলের সময় শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ও সনাক্তকরণ প্রযুক্তিকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়। ফলে প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে সফল আঘাত হানার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছরের জানুয়ারিতে দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘১০০ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’-র আওতায় দ্বিপক্ষীয় যৌথ গবেষণায় এ সামরিক উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যেই ইউক্রেনকে এই ক্যাটাগরির কয়েক হাজার জ্যামার সামরিক সহায়তা হিসেবে সরবরাহ করা হয়েছে। ইউক্রেনের দেশীয় সামরিক কারখানায় প্রযুক্তিটির সার্বিক উৎপাদন শুরু হলে এটি যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রজন্মের দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। প্রযুক্তিটির সফল প্রয়োগ দুই দেশের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষায় সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য সর্বমোট ২৫ বিলিয়ন পাউন্ডের (প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সহায়তা পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ বিলিয়ন পাউন্ড সরাসরি সামরিক সরঞ্জাম, আধুনিক অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় হয়েছে। লন্ডনের এই ধারাবাহিক সহায়তা ইউরোপীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য সফর সমাপ্ত করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মঙ্গলবার ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। সেখানে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। পাশাপাশি সম্প্রতি প্রয়াত ইউক্রেন-সমর্থক বিশিষ্ট মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফর ইউক্রেনের আন্তর্জাতিক সমর্থন সুসংহত করতে নতুন কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করবে।