ধর্ম ডেস্ক
পবিত্র মক্কা আল-মুকাররমার মসজিদুল হারাম এবং মদিনা আল-মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে জুমার খুতবায় মুসলিম উম্মাহর পারিবারিক জীবন, সুশিক্ষা ও ঈমানি দৃঢ়তার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ব মুসলিমের পরম শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু এই দুই ঐতিহাসিক পবিত্র স্থান থেকে প্রচারিত বার্তা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। গত শুক্রবারের জুমার খুতবায় মদিনার মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুল-মুহসিন আল-কাসিম শৈশব থেকেই সন্তানকে সুশিক্ষা, সুসংহত নৈতিকতা ও ঈমানি চেতনায় গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। অন্যদিকে, পবিত্র মসজিদুল হারামের খতিব শায়খ ড. বান্দার বালিলা বিশ্বব্যাপী উদ্ভূত নানা সামাজিক পরীক্ষা, প্রলোভন ও সংশয়ের যুগে সত্যের ওপর এবং ঈমানের ওপর অবিচল থাকার কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
মসজিদে নববীর খুতবায় শায়খ আবদুল-মুহসিন আল-কাসিম পারিবারিক কাঠামোর মৌলিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করে বলেন, সন্তানরা মহান আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে পিতা-মাতার কাছে এক পরম আমানত। এই আমানতের সুরক্ষায় শিশুকাল থেকেই তাদের হৃদয়ে স্রষ্টার প্রতি ভয় ও ভালোবাসা, সময়মতো সালাত আদায়ের অভ্যাস এবং পবিত্র কোরআন অনুধাবন ও অনুশীলনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি করা অভিভাবকের প্রধান কর্তব্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন আদর্শ পিতার ও মাতার অন্যতম কাজ হলো সন্তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক কোমল ও সদয় আচরণ করা, তাদের সহজাত মেধা ও সক্ষমতাকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশিত আদর্শের আলোকেই পরিচালিত করা। একই সঙ্গে সন্তানের ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে নিয়মিত দোয়া করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। খতিবের মতে, এক নিষ্ঠাবান ও সুসন্তান গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল একক কোনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার নয়, বরং এটি পিতা-মাতার যৌথ সামাজিক ও ঈমানি অঙ্গীকার, যা ইহকালে শান্তি ও পরকালে নিরবচ্ছিন্ন বরকত বয়ে আনে।
বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রযুক্তির অবাধ বিস্তার, পারিবারিক সম্পর্কের শিথিলতা এবং সার্বিক সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে মসজিদে নববীর খতিবের এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সমাজের নানা প্রতিকূলতা ও মানসিক চাপ সামলাতে তরুণ প্রজন্ম যখন প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন শিশুকাল থেকে পাওয়া ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধই তাদের সঠিক পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। শৈশব থেকে অর্জিত এই চরিত্র গঠন ও নিয়মিত ইবাদতের চর্চা তাদের যেকোনো ধরনের অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অনাচার থেকে রক্ষা করতে কার্যকর ঢাল হিসেবে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবায় খতিব শায়খ ড. বান্দার বালিলা সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, প্রলোভন ও সামাজিক পরীক্ষার মুখে নিজেদের ঈমান সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বস্তুবাদের প্রভাবে আচ্ছন্ন বর্তমান সমাজে সত্য ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে রাখাই একজন মুমিনের জীবনযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য এবং পরকালীন নাজাতের একমাত্র মাধ্যম। ঈমানকে সব ধরনের সংশয় ও বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি বিনম্র চিত্তে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করা, নিয়মিত পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও গভীর অনুধাবন করা এবং কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও ধৈর্যের জীবন থেকে প্রেরণা গ্রহণের পথ নির্দেশ করেন।
যেকোনো ফিতনা, কঠিন সংকট ও মানসিক অস্থিরতার মুহূর্তে মুসলিম সমাজকে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান শায়খ বালিলা। তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে আবেগের বশবর্তী না হয়ে চরম ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই মুমিনের প্রধান গুণ। তিনি ইসলামের শাশ্বত মূলনীতি উল্লেখ করে বলেন, চরম সংকটকালেও পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিকাকে অবিচলভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে, যা মানুষকে সকল ভ্রান্ত পথ থেকে হেফাজত করবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের সুদূর প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রতি সপ্তাহে মক্কা ও মদিনার এই দুটি পবিত্র প্রাঙ্গণে একত্র হয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং সরাসরি খুতবা শ্রবণ করেন। এছাড়া স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই বক্তব্য শোনেন। ফলে দুই পবিত্র মসজিদের মিম্বর থেকে প্রচারিত এসব দিকনির্দেশনা বিশ্ব মুসলিমের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন গঠনে এক সুদূরপ্রসারী আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সার্বিক নৈতিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ দিশারি হিসেবে কাজ করে।