আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যৌুন হয়রানি ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর করিম খানকে দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের সদস্যদেশগুলোর পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টি’র এক বিশেষ অধিবেশনে ভোটের মাধ্যমে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সদস্য দেশগুলোর এই পদক্ষেপকে আইসিসির ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা সংস্থাটির ভাবমূর্তি ও অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়ার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টির বিশেষ অধিবেশনে আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৮২টি রাষ্ট্র করিম খানকে অপসারণের পক্ষে মত দেয়। এর আগে গত জুনে আদালতের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটি করিম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত শেষে গুরুতর অসদাচরণের প্রমাণ পায় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরবর্তী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে স্থায়ীভাবে অপসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে চূড়ান্তভাবে পদচ্যুত করা হলো।
করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূচনা হয় প্রায় দুই বছর আগে। আইসিসিতে তাঁর অধীনে কর্মরত এক নারী সহকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক ও অসম্মতিমূলক যৌন আচরণের অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই একটি দীর্ঘ শাস্তিমূলক তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। তবে ৫১ বছর বয়সী ব্রিটিশ আইনজীবী করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছেন। তাঁর আইনজীবীদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্তের পর এই ষড়যন্ত্র বেগবান হয় বলে তাদের দাবি।
যুক্তরাজ্যের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী করিম খান ২০২১ সালে নয় বছরের মেয়াদে আইসিসির প্রসিকিউশন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত পরিচালনা ও বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। দায়িত্ব পালনকালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শীর্ষ বিশ্বনেতাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন। বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর তীব্র অসন্তোষ সত্ত্বেও তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, কিন্তু সংস্থার ভেতরের অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা ও আচরণবিধি সংক্রান্ত সংকট শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রশাসনিক মেয়াদের অবসান ঘটাল।
করিম খানের আইনজীবী দল আন্তর্জাতিক আদালতের এই অপসারণ প্রক্রিয়াকে আইনগত ও পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। তাঁদের মতে, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাঁকে নিরপেক্ষ ও যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে এই অপসারণের সিদ্ধান্তের বৈধতা ও আইনি ন্যায্যতা চ্যালেঞ্জ করে তারা বিশ্ব আদালতে বা আন্তর্জাতিক বিচারিক ফোরামে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আইসিসির প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর এই ঘটনার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে তা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, চিফ প্রসিকিউটরের পদচ্যুতি আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলা কিংবা পূর্বে জারিকৃত কোনো পরোয়ানা কার্যকরের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ অন্যান্য হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাগুলো যথারীতি বহাল থাকবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখতেই সদস্য দেশগুলো করিম খানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।