আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দরনগরী হোদাইদাহে সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী। এই সামরিক পদক্ষেপের পরপরই সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ানবু প্রদেশে জাতীয় আগাম সতর্কীকরণ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। তবে পরবর্তীতে ঝুঁকির মাত্রা কমে আসায় এই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং ঘটনায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
শনিবার সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে পশ্চিম উপকূলীয় কৌশলগত ইয়ানবু প্রদেশের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে এই সংকেত পাঠানো হয়। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিবাসীদের জরুরি ভিত্তিতে সতর্ক করা হলেও সম্ভাব্য নিরাপত্তার হুমকির সুনির্দিষ্ট কারণ প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে অন্য এক হালনাগাদ বার্তায় বিভাগটি জানায় যে বিপদ কেটে গেছে, ফলে জারি করা বার্তাটি আর কার্যকর থাকছে না।
এই নিরাপত্তা সতর্কতার পটভূমিতে রয়েছে লোহিত সাগরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক আক্রমণ ও তার জবাবে সৌদি জোটের পাল্টা সামরিক তৎপরতা। লোহিত সাগরে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক সামুদ্রিক যানবাহনে হামলার জের ধরে শুক্রবার গভীর রাতে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় হোদাইদাহ প্রদেশে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সমন্বিত বিমান হামলা পরিচালনা করে সামরিক জোট। যৌথবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষিত রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুমকি নস্যাৎ করতে হুথিদের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে এই পরিমিত সামরিক জবাব দেওয়া হয়েছে।
সৌদি জোটের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্টভাবে জানানো হয়, সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক অবকাঠামো কিংবা হোদাইদাহ বন্দরের সাধারণ কার্যক্রমকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। বাণিজ্যিক সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হোদাইদাহ, রাস ঈসা ও সালিফসহ ইয়েমেনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক আকাশপথ সাধারণ যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এর বিপরীতে হুথি পরিচালিত তথ্যমাধ্যমগুলো দাবি করে, যৌথবাহিনীর বিমান থেকে হোদাইদাহ শহরের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এবং উপকূলীয় কামারান দ্বীপের সামরিক আস্তানায় একাধিক আঘাত হানা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক এ উত্তেজনার প্রভাব অঞ্চলটির অর্থনীতিতে ব্যাপক বিস্তৃত। বিশ্বের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব বর্তমানে তাদের সমুদ্রপথে জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশের জন্য লাল সাগরের উপকূলীয় ইয়ানবু বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে কৌশলগত প্রণালীগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হলে এই নৌপথটি জ্বালানি পরিবহনে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই অঞ্চলে কোনো ধরনের সামরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেলে তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৪ সালে শিয়া সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ২০১৫ সালে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট। দীর্ঘ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি অঞ্চলটিতে অনেকটাই শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সম্প্রতি নৌপথে নতুন করে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ এবং লোহিত সাগরে ব্লকেড বা নৌ অবরোধ সংক্রান্ত সামরিক তৎপরতা ওই ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে পুনরায় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। যৌথ সামরিক কমান্ড থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌসীমানায় বাণিজ্যিক পরিবহনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টার জবাবে তারা আপসহীনভাবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ বজায় রাখবে।