আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন রাজনৈতিক শর্ত আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে রিয়াদ ইসরায়েলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান না করলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সম্পর্কিত নিজের নতুন অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সামনেও তা পুনর্ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ এবং সৌদি সরকারের যৌথ উদ্যোগে ওয়াশিংটনে একটি দ্বিপাক্ষিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন প্রযুক্তি, কৌশলগত তথ্য ও দক্ষতা হস্তান্তরের মাধ্যমে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম পারমাণবিক শক্তি রিয়্যাক্টর নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তিটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আব্দুলআজিজ বিন সালমান দ্বিপাক্ষিক এই প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পরপরই তা উভয় দেশের বাণিজ্যিক ও সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বলে ঘোষণা করা হয়। তবে চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়ার ঠিক এক দিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে প্রস্তাবিত এই চুক্তি চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে সৌদি আরব কর্তৃক ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ খসড়া জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা না হলেও জানা গেছে, এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি রিয়াদে পৌঁছাবে। তবে এতে সরাসরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কোনো অনুমতি সৌদি আরবকে দেওয়া হবে না বলে মার্কিন প্রশাসন পরবর্তীতে স্পষ্ট করে। চুক্তিটি প্রায় ৩০ বছর মেয়াদে কার্যকর রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মার্কিন আইন অনুসারে বর্তমানে পর্যালোচনার অংশ হিসেবে চুক্তিটি মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া এই ধরণের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নিরস্ত্রীকরণ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে কিছু বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অপরদিকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ চুক্তি জাতীয় জ্বালানি উৎসকে বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে।
পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে ইসরায়েলকে স্বীকৃতির বিষটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হলেও এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো বিবৃতি বা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নীতিগত কূটনৈতিক অবস্থানে অবিচল রয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে একাধিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট নীতি ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করবে না রিয়াদ। একই সময়ে ইসরায়েলের বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রশাসন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের নীতিগত প্রস্তাবনার তীব্র বিরোধিতা চালিয়ে আসছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির আহ্বানের বাস্তবায়ন বর্তমানে বড় ধরনের রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলের ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন এবং পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসন—উভয়ই আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরবকে এই চুক্তির আওতায় আনতে দীর্ঘ দিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি দেওয়া সাপেক্ষে পারমাণবিক সহায়তা দেওয়ার মার্কিন কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের পুরো আঞ্চলিক সম্পর্কের সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র কাঠামোর দাবি অমীমাংসিত রেখে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্ত মেনে নেবে নাকি নিজেদের দীর্ঘদিনের নীতিতে অটল থাকবে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এখন সেটাই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।