বিনোদন ডেস্ক
বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় ও প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে সম্মাননা জানাতে শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে আয়োজিত হয়েছে এক বিশেষ সংগীতসন্ধ্যা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রুনা লায়লার একক সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। দীর্ঘ ছয় দশকের সংগীত জীবনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে এটিই ছিল তাঁর প্রথম একক অনুষ্ঠান, যা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বরেণ্য এই শিল্পীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী মঞ্চে উপস্থিত হয়ে রুনা লায়লার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শিল্পকলা একাডেমির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সহায়তার তহবিল গঠনের লক্ষ্যেই এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মানবিক এই উদ্যোগের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পীর অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটির তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
সম্মাননা গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় মূল পর্ব। রুনা লায়লা তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তিনি প্রথমেই গেয়ে শোনান বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছো প্রাণ’। এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের জন্য গান পরিবেশন করেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি আধুনিক, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান এবং দেশাত্মবোধক সংগীত মিলিয়ে মোট ১০টি গান পরিবেশন করেন। শিল্পীর পরিচিত ও জনপ্রিয় গানগুলোর পরিবেশনার সময় উপস্থিত দর্শকরাও তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। আয়োজক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির প্রথম দিনেই নির্ধারিত সব আসন পূর্ণ হয়ে যায়, যা বরেণ্য এই শিল্পীর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনুরাগের প্রমাণ বহন করে। সবশেষ রাত সোয়া ৯টার দিকে উপমহাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সুফি ঘরানার গান ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রুনা লায়লা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রথমবারের মতো এই মঞ্চে একক অনুষ্ঠান এবং সম্মাননা প্রাপ্তিতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে বন্যা দুর্গত মানুষের সহায়তায় এমন একটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি আয়োজকদের সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, অনেক বছর পরে হলেও এ ধরনের আয়োজনের জন্য শিল্পকলা একাডেমি প্রশংসার দাবিদার। একটি মানবিক ও মহৎ উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমির এগিয়ে আসাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও যোগ করেন, দেশের স্বার্থে সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের সংকটকালীন মুহূর্তে শিল্প ও শিল্পীদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এমন অংশগ্রহণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে মত প্রকাশ করেন উপস্থিত সুধীজন।
উপমহাদেশের সংগীত অঙ্গনে রুনা লায়লা একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। তাঁর সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় জুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতুসহ অন্তত ১৮টি ভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন, যা বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। ষাট ও সত্তরের দশকে করাচি এবং মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) চলচ্চিত্র শিল্পে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন। ভারত, পাকিস্তানসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁর গান সমানভাবে জনপ্রিয় এবং বহু প্রবীণ ও খ্যাতিমান শিল্পী তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
রুনা লায়লার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সংগীত পরিমণ্ডলে হওয়ার কারণে শৈশব থেকেই তিনি সংগীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে গজল, পপ এবং আধুনিক গানে তিনি নিজের অনন্য শৈলী তৈরি করতে সক্ষম হন। তাঁর গায়কী এবং মঞ্চ পরিবেশনার নিজস্ব ঢং তাঁকে সমসাময়িক অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা এক পরিচিতি এনে দেয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান যুগের পর যুগ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশে-বিদেশে অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননাতেও ভূষিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মূল মঞ্চে এমন গুণী মাপের শিল্পীর পরিবেশনা এবং তাঁকে সম্মাননা প্রদানের বিষয়টি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংস্কৃতিজনেরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবীণ ও কীর্তিমান শিল্পীদের জীবিত অবস্থায় যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হলে তা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি, বিনোদনমূলক আয়োজনের মাধ্যমে দুর্যোগপীড়িত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি অনুসরণীয় মডেল হতে পারে। শিল্প ও মানবতার এমন মেলবন্ধন ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।