অপরাধ ও বিচার ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং এর আলামত ধ্বংসের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গণকবর দেওয়া হয়েছে এবং একটি হাসপাতাল থেকে অনেক মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শহীদদের মোট সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থান পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি। পরিদর্শনকালে তিনি সেখানে উপস্থিত শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দাবির বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
চিফ প্রসিকিউটরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের সরকারি গেজেটে এ পর্যন্ত ৮৬৫ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য ও তদন্ত অনুযায়ী, এই তালিকার বাইরেও বিপুলসংখ্যক মরদেহ বিভিন্ন স্থানে গণকবর দেওয়া হয়েছে এবং নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। মো. আমিনুল ইসলাম জানান, জুরাইন, মাতুয়াইল, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকায় গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে বর্তমানে এসব কবরে থাকা শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে কিছু নমুনার রিপোর্টও হাতে এসেছে। এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে শহীদদের সরকারি তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাসপাতাল থেকে নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর জানান, একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল থেকে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্তে প্রসিকিউশন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।
পরিদর্শনকালে চিফ প্রসিকিউটর সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, এই গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনার পরপরই আলামত নষ্ট এবং লাশ গুম করার এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। প্রসিকিউশন তদন্তের মাধ্যমে সেই অপচেষ্টার প্রতিটি ধাপ উন্মোচন করছে।
তদন্ত কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে তিনি শহীদ পরিবারসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণহত্যা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা প্রমাণ কারো কাছে থাকলে তা প্রসিকিউশনকে সরবরাহ করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা আরও সহজতর হবে।
পরিদর্শন শেষে তিনি শহীদ পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই প্রসিকিউশনের মূল লক্ষ্য। যারা আলামত নষ্ট করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এই মামলাটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে কোনো ঘাটতি রাখা হবে না বলে তিনি পুনরায় দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন।