আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা পঞ্চম দিনের মতো ভয়াবহ সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ধারাবাহিক হামলায় ইরানের অন্তত ৭ জন সেনা ও ৩০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। গত কয়েকদিনের এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আহত হয়েছেন অন্তত ২৬০ জন মানুষ, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় এই ঘটনাপ্রবাহকে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির বমপুর এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটিতে ১৩টি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এই হামলায় ৩৮৮তম ব্রিগেডের ৭ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে ঘাঁটির অতিথিশালা, প্রহরীদের চৌকি এবং সেনাদের আবাসন এলাকা লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়েছে। ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা সীমিত করা সম্ভব হয়েছে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী একে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং উপযুক্ত সময়ে এর কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ ইরানেও মার্কিন হামলার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। ইরানের সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনের লাগাতার হামলায় দক্ষিণ ইরানে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে ৩০ জনের বেশি। দেশটির প্রশাসনিক কাঠামোতে দক্ষিণ ইরানকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রাণহানির ঘটনায় সরকার গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হতাহতের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, সব মিলিয়ে আহত মানুষের সংখ্যা ২৬০ ছাড়িয়েছে। আহতদের মধ্যে অন্তত তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ২২২ জনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
কেবল আকাশপথেই হামলা সীমাবদ্ধ রাখেনি মার্কিন বাহিনী। একই সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে নতুন করে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, যা দেশটির আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। টানা পাঁচ দিন ধরে চলা এই আক্রমণ ও অবরোধের ফলে ইরানের জনজীবনে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। স্থানীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই সামরিক উত্তজনা কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পুরো আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে পরিচালিত এই সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ সামরিক পাল্টা আক্রমণের পথে না হাঁটলেও, তাদের সেনাবাহিনীর দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই সংকট অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে।
বর্তমানে দক্ষিণ ইরানসহ আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।