রাজনীতি ডেস্ক
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। ২০১৯ সালের এই দিনে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রয়াণ দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় পার্টি রাজধানী ঢাকা এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণের মাধ্যমে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রংপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মাইকযোগে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং এরশাদের বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মরহুমের স্মরণে বিশেষ মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নেবেন।
আজ সকাল ১১টায় রংপুর নগরীর দর্শনায় অবস্থিত সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘পল্লী নিবাস’ প্রাঙ্গণে তার সমাধিস্থলে বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, পুষ্পস্তবক অর্পণ, কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠ। পরবর্তীতে সেখানে এক স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ দলের শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ রংপুরে অবস্থান করছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে দেশভাগের পর তিনি পরিবারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রংপুরে চলে আসেন। রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজ থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করার পর তিনি ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে আটকে পড়েন এবং ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দেশ শাসন করেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিলেন।
ক্ষমতা ছাড়ার পর নব্বইয়ের দশকে তাকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি ও তার দল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বজায় রেখেছিল। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে তার ব্যাপক ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল, যার ফলে কারাবন্দী অবস্থাতেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে একাধিক আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নয় বছরের শাসন আমলে দেশের উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন, জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মরণসভা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করছেন দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা।