জাতীয় ডেস্ক
মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ২৯০ জন বাংলাদেশিসহ অন্তত ৫০৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। দেশটির ১৮টি ভিন্ন স্থানে একযোগে পরিচালিত একটি বিশেষ যৌথ অভিযানে তাঁদের আটক করা হয়। মূলত অবৈধভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং অনুমোদনহীনভাবে বিদেশিদের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে এই চিরুনি অভিযান চালানো হয়। সোমবার (১৩ জুলাই) এক বিবৃতিতে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক জাকারিয়া শাবান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিবৃতিতে জানানো হয়, এই বিশাল যৌথ অভিযানে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ, জাতীয় নিবন্ধন বিভাগ, রাজকীয় পুলিশ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রায় ৮৭৬ জন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। অভিযান চলাকালীন সন্দেহভাজন এলাকাগুলো থেকে নিয়োগকর্তা ও বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২ হাজার ২৬০ জনের নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলায় ৫০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে ২১ থেকে ৫২ বছর বয়সি ৯৫ জন নারীও রয়েছেন। তাঁদের সবাইকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও নিবিড় তদন্তের জন্য বিভিন্ন ইমিগ্রেশন ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আটককৃত বিদেশি নাগরিকদের জাতীয়তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরাবরের মতোই এই সংখ্যায় বাংলাদেশিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মোট আটককৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন ২৯০ জন। এছাড়া মিয়ানমারের ১০১ জন, ইন্দোনেশিয়ার ৬৬ জন, নেপালের ৩৮ জন, ভারতের ৩৬ জন এবং অন্যান্য দেশের ১০ জন নাগরিক রয়েছেন। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে এবং সাক্ষী হিসেবে সহায়তার জন্য আরও ১২০ জন ব্যক্তিকে বিশেষ নোটিশ (বোরং ২৯) প্রদান করা হয়েছে।
মালয়েশীয় ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আটককৃতদের বিরুদ্ধে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথমত, অনেকের কাছে বৈধ কোনো ভ্রমণ বা কাজের নথিপত্র ছিল না। দ্বিতীয়ত, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান (ওভারস্টে) করছিলেন অনেকে। এবং তৃতীয়ত, ভিসার শর্তাবলির চরম অপব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কর্মকর্তারা জানান, আটক অনেক কর্মীর ভিসা মূলত নির্মাণ খাতের জন্য ইস্যু করা হলেও, তারা অবৈধভাবে বিভিন্ন কাপড়ের দোকান বা খুচরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া, আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজন জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) কার্ডধারীও রয়েছেন, যাদের কার্ডের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসী ও অননুমোদিত ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে আসছে। ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক জাকারিয়া শাবান জানিয়েছেন, পুরো মালয়েশিয়াজুড়ে প্রায় দুই শতাধিক ‘হটস্পট’ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, যা অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এই চিহ্নিত এলাকাগুলোর প্রায় অর্ধেকই দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল ক্লাং ভ্যালি এলাকায় অবস্থিত। এসব এলাকায় আগামী দিনগুলোতেও পর্যায়ক্রমে এ ধরনের কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়, এক খাতের ভিসা নিয়ে অন্য খাতে কাজ করতে গিয়ে তারা আইনি জটিলতায় পড়েন। অনেক সময় অসৎ দালালচক্র বা মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে সাধারণ কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। নির্ধারিত খাতে কাজ না পেয়ে জীবন ধারণের তাগিদে বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে অন্য খাতে যুক্ত হন তারা, যা দেশটির আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধরনের ধরপাকড়ের ফলে একদিকে যেমন হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী কর্মসংস্থান হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে দেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে আটক প্রবাসীদের সুরক্ষায় জরুরি আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা প্রদানের ওপর জোর দিচ্ছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে যারা প্রকৃতপক্ষে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধ উপায়ে এবং সঠিক ভিসায় কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকার বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।